সরকারি হলে জরিমানা মাফ, বেসরকারিতে বাধ্যতামূলক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ছাড়া তেল পরিশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন নদী দূষণ করে আসছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। কর্ণফুলী দূষণের যথেষ্ট প্রমাণ মিললেও সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বারবার পার পেয়েছে তারা। তবে গত বছর প্রথমবারের মতো ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরানো’র উদ্যোগ নেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এত বছরের দূষণ বাদ দিয়ে মাত্র ১১৮ দিনের পরিবেশগত ক্ষতি হিসাব করে অধিদপ্তর। এতে পরিবেশ দূষণ-সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা ধার্য হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
তবে মন্ত্রণালয়ের ইশারায় এবারও পার পেয়ে যায় ইআরএল। শুনানি শেষে জরিমানার আদেশে স্বাক্ষর হলেও আন্তঃমন্ত্রণালয় তদবিরের কারণে কার্যকর করা যায়নি তা। ইআরএলের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে জরিমানা মওকুফ পেয়ে যায় বারবার। কিংবা আপিলে তাদের জরিমানার বিষয়টি অনিষ্পন্ন থাকে বছরের পর বছর। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মাধ্যমে পাহাড় কাটা, বনের ভেতর রাস্তা নির্মাণ ও নদী দূষণ বেশি হয়।
অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। সরকারি সংস্থা ছাড় পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিপূরণ বেশিরভাগ নগদে দিতে করা হয় বাধ্য। পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরে পরিচালনা করে ৭৪টি এনফোর্সমেন্ট অভিযান। এর থেকে ৬৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়, যার বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জরিমানা পরিশোধ না করলে নিয়মিত মামলা হয়। যেমন পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করায় খুলশী ক্লাবের বিরুদ্ধে হয়েছে মামলা। এরকম মোট মামলা ১৯টি।
বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এভাবে জরিমানা মওকুফ পাওয়ার উদাহরণ পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠান বিধায় দূষণের অপরাধে তারা সুরক্ষা পাবে— এমন ধারণা তৈরি হয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। সরকারি সংস্থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো দূষণের অপরাধে মামলা, জরিমানা ইত্যাদির আওতায় আনতে হবে। কোনো ছাড় নয়। কর্মকর্তাদেরও এজন্য দায়বদ্ধ করতে হবে। তাহলে পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষা হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে এনফোর্সমেন্ট মামলার আপিলের অপপ্রয়োগ হয়। জরিমানার অঙ্ক ছোট হয়, মাফও পায়। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অবৈধ স্বার্থের প্রভাবমুক্ত আপিল হতে হবে।’
ইস্টার্ন রিফাইনারির ‘ক্ষমাযোগ্য’ দূষণ
দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৮ সালে প্রথম বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। প্রতিষ্ঠানটিতে ইটিপি ছিল না। তেল পরিশোধন করে তরল বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে ফেলে আসছিল তারা। পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার সতর্ক করেছিল। গত বছরের ২৭ মে অধিদপ্তরের গবেষণা দল ইআরএল পরিদর্শন করে তরল বর্জ্যের নমুনা পরীক্ষা করে। ওই বছরের ১১ আগস্ট অধিদপ্তরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ইআরএলকে পরিবেশের শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নির্গত তরলের ফেনল (অম্লীয় জৈব রাসায়নিক যৌগ), ভাসমান কঠিন পদার্থ (টিএসএস) ও জৈব অক্সিজেন চাহিদা (বিওডি) প্যারামিটারের মান পরিবেশ সংরক্ষণ আইন পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী অতিক্রম করেছে গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের হচ্ছে মারাত্মক ক্ষতি।
গত বছরের ২৮ আগস্ট জাকির হোসেন সড়কের পরিবেশ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানিতে ইআরএলের দুই সহ-মহাব্যবস্থাপক (এজিএম-ইন্সপেকশন অ্যান্ড পলিউশান কন্ট্রোল) প্রদীপ কুমার চৌধুরী ও মোহাম্মদ শামিউল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে ইআরএল প্রতিনিধিরা অপরিশোধিত তরল বর্জ্যে দূষণের বিষয়টি স্বীকার করেন। তাদের এপিআই তরল বর্জ্য সেপারেটর রয়েছে দাবি করেন তারা। পাশাপাশি একটি ইটিপি স্থাপনের কাজ ৮০ ভাগ সম্পূর্ণ হয় বলে জানিয়েছেন।
শুনানি শেষে পরিবেশ পরিচালক ২০২৪ সাল থেকে মাত্র ১১৮ দিনে ইআরএলের পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতিসাধন-সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ ধার্য করেন ২ কোটি ৯৫ লাখ ৮ হাজার ২৬০ টাকা। পরিচালক সোনিয়া সুলতানা ও উপপরিচালক রোমানা আক্তার স্বাক্ষরিত এই আদেশ ইআরএল প্রতিনিধিদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ক্ষতিপূরণ আদেশের পর আন্তঃমন্ত্রণালয়ে শুরু হয় দেন দরবার। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, ওই সময়ে এটা কার্যকর করা হলে সারা দেশে জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়বে।
ফলে স্বাক্ষরের পরও শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের ওই আদেশ কার্যকর হয়নি। দূষণের বিষয়টি স্বীকার করে সোনিয়া সুলতানা আগামীর সময়কে বললেন, ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি সরকারি সংস্থা। দূষণের কারণে তাদের গত বছর শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। তারা নতুন ইটিপি স্থাপন করছে বলে জানিয়েছে। সেই ইটিপি পরিদর্শন করে তা অনুমোদন দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ইআরএলের এজিএম প্রদীপ কুমার চৌধুরী বললেন, ‘আমাদের শুরু থেকে এপিএ ওয়েল সেপারেটর রয়েছে। সরাসরি নদীতে বর্জ্য ছাড়ি না। মাঝেমধ্যে দু-একটি প্যারামিটার এদিক-সেদিক হয়। গত বছর আমাদের ডেকেছিল। জরিমানার বিষয়টি তখন সমাধান হয়ে গেছে। এখন নতুন ইটিপির কমিশনিং চলছে।’
নতুন ইটিপির কার্যক্রম পরিদর্শন করেছে অধিদপ্তর। তাতেও দূষণ মিলেছে বলে জানালেন নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক কর্মকর্তা।
‘ছাড়’ পাওয়া সরকারি সংস্থা
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের সময় লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় ২০টি পাহাড় কাটা ও একটি খাল ভরাট করা হয়। এজন্য ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা করেছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন। এগুলো হলো— তমা কনস্ট্রাকশন ও হাসান ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠান দুটি আপিল করে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের জরিমানা করা হয় মওকুফ।
মোয়াজ্জম হোসাইন বর্তমানে বাংলাদেশ চা-বোর্ডের সদস্য। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘তারা রেললাইন নির্মাণের জন্য অনুমোদিত এলাকার বাইরে গিয়ে পাহাড় কেটেছিল। সে কারণে জরিমানা করা হয়। পরে আপিলে মন্ত্রণালয় থেকে মওকুফ পায় বলে জেনেছি।’
চট্টগ্রামে বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণের সময় ১৫টি পাহাড় কেটেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তর এনফোর্সমেন্ট অভিযান করে সিডিএকে এজন্য ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৬৯ টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করে। সিডিএ আপিল করে। এখনো ঝুলে রয়েছে বিষয়টি।
একইভাবে পাহাড় কেটে ‘বারইয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক নির্মাণের অপরাধে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে ২০২৫ সালে ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেটাও পরিশোধ হয়নি।
ইটিপি ছাড়া জন্ম থেকে চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস (কেপিএম)। কেপিএম দিনে ছয় ঘণ্টা চালু থাকলে ৭ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি পড়ে কর্ণফুলী নদীতে। ২০১৫ সালে নদী দূষণের জন্য কেপিএমকে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করেনি তারা।
এ ছাড়া দূষণের দায়ে তেলভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে করা হয়েছিল জরিমানা। কিন্তু আপিল পর্যায়ে গিয়ে তা মওকুফ পেয়ে যায়।
পদ্মাসেতু রেল সংযোগ ও মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ চলার সময় বায়ুদূষণের দায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প সংস্থাকে জরিমানা করেছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে উন্নয়নকাজের স্বার্থে উচ্চ আদালত থেকে জরিমানায় স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের জন্য ঢাকা ওয়াসা এবং সিটি করপোরেশনকে একাধিকবার জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে উচ্চ আদালতে গড়ায় বিষয়টি। আপিলে তারা যুক্তি দেখায়, সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের অর্থদণ্ড মানে জনগণের করের টাকার অপচয়। ফলে জরিমানা আদায়ের পরিবর্তে তাদের ইটিপি স্থাপন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণের শর্তে দেওয়া হয় ছাড়।



