পাখিদের যৌন আচরণ নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য, ভাঙল দীর্ঘদিনের ধারণা

সংগৃহীত ছবি
পোষা পাখির খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক মালিকই কখনো না কখনো অদ্ভুত এক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন। পাখিটি বারবার তার বসার ডালে শরীর ঘষছে, ডানা ঝাপটাচ্ছে কিংবা অস্বাভাবিক কিছু শব্দ করছে। প্রথমবার এমন আচরণ দেখলে অনেকেই বিস্মিত হয়ে যান।
এমন আচরণ দেখে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়। পাখিটি কি অসুস্থ? নাকি একাকীত্বে ভুগছে? দীর্ঘদিন ধরে অনেকের ধারণা ছিল, এ ধরনের আচরণ মানসিক চাপ, বিরক্তি বা বন্দিদশাজনিত সমস্যার লক্ষণ। ফলে অনেক মালিকই বিষয়টিকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখেছেন।
বছরের পর বছর ধরে পাখিপ্রেমীদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, এই ধরনের আত্মতৃপ্তিমূলক আচরণ আসলে বন্দিদশার চাপ, মানসিক অস্বস্তি বা অস্বাভাবিকতার লক্ষণ। তাই অনেক মালিক পাখিকে এমন আচরণ থেকে বিরত রাখতে নানা ব্যবস্থা নিয়েছেন। কেউ খাঁচার খেলনা সরিয়ে ফেলেছেন, কেউ বসার ডাল বদলেছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হরমোন চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পাখিদের এই আচরণ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালান। তারা পাখি বিশেষজ্ঞ, প্রজননকারী, পোষা পাখির মালিক এবং অনলাইন পাখিপ্রেমী গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি পূর্বের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাও বিশ্লেষণ করেন। সব মিলিয়ে ১২০টি প্রজাতির পাখির আচরণ পর্যালোচনা করা হয়। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর।
গবেষণায় দেখা যায়, শুধু খাঁচাবন্দি পাখিই নয়, বন্য পরিবেশে বসবাসকারী পাখিরাও নিয়মিত এই আচরণ করে। অনেক ক্ষেত্রে বন্য পাখিদের মধ্যেই এটি আরও বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ এটি বন্দিদশার কারণে তৈরি কোনো সমস্যা নয়।
গবেষণার প্রধান গবেষক ক্লোই হেইসের ভাষ্য, আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, আত্মতৃপ্তি বন্দিদশার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নয়। এটি পাখিদের স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর যৌন আচরণের একটি অংশ।
গবেষণায় আরও জানা যায়, পুরুষ পাখিরা সাধারণত বসার ডাল, খেলনা বা আশপাশের কোনো বস্তুর সঙ্গে শরীর ঘষে এই আচরণ প্রকাশ করে। কখনো কখনো তারা মালিকের হাত বা কাঁধকেও ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে স্ত্রী পাখিরা বিশেষ শারীরিক ভঙ্গির মাধ্যমে একই ধরনের আচরণ প্রদর্শন করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিষয়টিকে মানুষের সামাজিক বা নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। প্রাণিজগতে প্রজননের বাইরেও নানা ধরনের যৌন আচরণ দেখা যায়, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনের অংশ। পাখিরাও এর ব্যতিক্রম নয়।
গবেষণার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। অনেক মালিক পাখির এই আচরণ দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও এটি বন্ধ করার পরামর্শ দেন।
কিন্তু গবেষকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অযথা বাধা দিলে পাখির মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
গবেষণাটির সহলেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ম্যাটিল্ডা ব্রিন্ডল। তিনি বলেছেন, ‘যখন বন্য পাখিদের মধ্যেই এই আচরণ ব্যাপকভাবে দেখা যায়, তখন এটিকে অস্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই। এই গবেষণা পাখিদের কল্যাণ ও পরিচর্যা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে।’
গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, প্রকৃতির আচরণকে সব সময় মানুষের মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। যে আচরণকে এতদিন সমস্যা বা অসুস্থতার লক্ষণ বলে মনে করা হয়েছে, সেটিই আসলে পাখিদের স্বাভাবিক জীবনচক্রের অংশ হতে পারে।
নতুন গবেষণা জানিয়ে দিল, আত্মতৃপ্তিমূলক আচরণ পাখিদের জন্য কোনো লজ্জার, অস্বাভাবিক বা ক্ষতিকর বিষয় নয়; বরং এটি তাদের স্বাভাবিক আচরণেরই একটি স্বীকৃত অধ্যায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




