ছয় মাসে খুনের অর্ধেকই ঢাকা-চট্টগ্রামে
- পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য
- দিনে ডাকাতির ঘটনা ৭টি, অপহরণ ৩
- খুনের ৪৩ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনের পর দিন খুন, ডাকাতি, অপহরণ আর নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ভারী হচ্ছে দেশের অপরাধের খাতা। নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে পুলিশের নথিভুক্ত পরিসংখ্যান বলছে, দেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে প্রতিদিন গড়ে সাতটি ডাকাতি, তিনটি অপহরণ এবং কমপক্ষে দুজন পুলিশ সদস্য হেনস্তার শিকার হয়েছেন। আর নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬২টি মামলা হয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অপরাধচিত্রে প্রায় প্রতিটি দিনই শুরু বা শেষ হয়েছে একাধিক সহিংস ঘটনার খবর দিয়ে। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জনপদ— কোথাও রাজনৈতিক কোন্দল, কোথাও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, মাদক বা চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঝরছে প্রাণ। পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন।
মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জুনে ৩২৬, মে মাসে ৩১০, এপ্রিলে ২৮৮, মার্চে ৩১৭ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড হয়েছে। তবে এগুলো শুধু পুলিশের নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে নানা ধরনের বিরোধ ও অপরাধী তৎপরতা। রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের পুনরুত্থান, মাদক ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং ব্যক্তিগত বিরোধ— সব মিলিয়ে সহিংস অপরাধের চিত্র ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
এ ঘটনা শুধু ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক নয়। বিভাগ ও জেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয়ও ঘটছে খুন, টার্গেট কিলিং এবং বন্দুক হামলার ঘটনা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন অপরাধী চক্র নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এর সঙ্গে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ, কয়েকজন শীর্ষ অপরাধীর সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সহিংস অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামেই ৪৩ শতাংশ খুন: পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এ রেঞ্জে ৪০৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। সেখানে ৬ মাসে ৩৬১টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রাম— এ দুই রেঞ্জেই দেশের হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৪৩ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।
এরপর রাজশাহী রেঞ্জে ১৮৩, খুলনায় ১৬৭, ময়মনসিংহে ১১৫, রংপুরে ১১৩, সিলেটে ১১২, বরিশালে ৯০ এবং রেলওয়ে রেঞ্জে ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মহানগরগুলোর মধ্যেও হত্যাকাণ্ডের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকা। গত ছয় মাসে এখানে ১২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরপর গাজীপুর মহানগরে ২৭, চট্টগ্রাম মহানগরে ২৫, খুলনায় ১৯, সিলেটে ১৭, রাজশাহীতে ১১, বরিশালে ৭ এবং রংপুর মহানগরে ৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
প্রতিদিন ৭ ডাকাতি, ৩ অপহরণ: হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। গত ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ১৭২টি ডাকাতির ঘটনা পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ ১৮০ দিনে প্রতিদিন গড়ে ৭টি করে ডাকাতি হয়েছে।
এর মধ্যে জুলাই মাসে ২১৩, জুনে ১৮৭, মে মাসে ২০৯, এপ্রিলে ২০৩, মার্চে ১৮১ এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৭৯টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।
একই সময়ে দেশে ৫১২ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনজন অপহৃত হয়েছেন। ১৮০ দিনে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন ৩১৭ জন পুলিশ সদস্য। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন।
এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ৬ মাসে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬২টি করে মামলা হয়েছে এই অপরাধে।
‘শুধু খুনের পর ব্যবস্থা নিলে হবে না’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বললেন, হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যান শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সূচক নয়। এর মধ্যে সমাজের ভেতরে সহিংসতার প্রবণতা, বিরোধ নিষ্পত্তির দুর্বলতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয়তারও প্রতিফলন রয়েছে।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, শুধু খুনের পর তদন্ত ও গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হবে না। অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, স্থানীয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাং দমন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো গেলে হত্যাকাণ্ড কমিয়ে আনা সম্ভব।
তার মতে, এরই ধারাবাহিকতা ঠেকাতে অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের উৎসও চিহ্নিত করতে হবে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার কারণগুলো খুঁজে বের করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে জোর পুলিশের: এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আগামীর সময়কে বললেন, কয়েক বছর ধরে খুনোখুনির হার প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা কমিয়ে আনতে পুলিশ কাজ করছে।
তিনি বলেছেন, পুলিশের প্যাট্রলিং বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের হার কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অধিকাংশ মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
তবে ছয় মাসের এই অপরাধচিত্র বলছে, শুধু তদন্ত ও গ্রেপ্তার নয়, বড় চ্যালেঞ্জ এখন অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানো। প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যাকাণ্ড, ৭টি ডাকাতি আর অসংখ্য নির্যাতনের মামলার এই বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে কতটা কার্যকর করা যায়— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।






