প্রেমের ঘরেই ডলির শেষ রাত, পরদিন মেলে দ্বিখণ্ডিত লাশ
- ঘুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যা
- ব্রিফকেস-বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে মরদেহ গুমের চেষ্টা

ডলি আক্তার। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে
একটি ব্রিফকেস। পাশে প্লাস্টিকের বস্তা। দুটোই ভাসছিল ডোবার পানিতে। গাজীপুরের জয়দেবপুরে মহাসড়কের পাশের ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয় সেগুলো। এরপর খুলতেই বেরিয়ে আসে এক নারীর খণ্ডিত, অর্ধগলিত মরদেহ। পরিচয়হীন সেই লাশ ঘিরে তৈরি হয় রহস্য। কে এই নারী? কী তার পরিচয়, কেন তাকে হত্যা করা হলো, আর কারাই বা লাশ গুমের চেষ্টা করল, একের পর এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। নিহতের নাম ডলি আক্তার (৩০)। পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্কের শেষ পরিণতিতেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হত্যার পর মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করে স্যুটকেস ও বস্তায় ভরে ফেলে দেওয়া হয় পানিতে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় ডলির প্রেমিক মো. মিশন ইসলাম (২২), মিশনের মা বানু আক্তার (৪৩) ও বন্ধু মো. মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উদ্ধার হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত বটি দা, ডলির জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন, জুতা ও মরদেহ প্যাকেট করার স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ।
গত ১১ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুরের ভবানীপুরে হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম দিকে খালের পানিতে ব্রিফকেস ও বস্তার মধ্যে খণ্ডিত মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহটি অজ্ঞাতপরিচয় হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করাই প্রথম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই গাজীপুর জেলা। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর থানায় একটি মামলা করেন।
পিবিআই জানায়, স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর জয়দেবপুরের বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় একাই থাকতেন ডলি। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি যান প্রেমিক মিশনের ভাড়া বাসায়। সেখানে মিশন, তার মা বানু ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। এরপর বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে যান। একই কক্ষে থেকে যান মিশন ও ডলি।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিয়ে ও আগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন মিশন। পরে ডলিকে ঘুমের ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে ঘুমন্ত ডলিকে লুঙ্গি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। তারপর মরদেহ রাখা হয় চৌকির নিচে। পরদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে মিশনের মা বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান বলে জানিয়েছে পিবিআই। এরপর শুরু হয় মরদেহ গুমের প্রস্তুতি। আনা হয় একটি স্যুটকেস। কিন্তু তাতে পুরো মরদেহ ধরে না। তখন বটি দা ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এক অংশ স্যুটকেসে। অন্য অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে শুরু হয় মরদেহ সরানোর পালা। মিশন তার বন্ধু মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন বলে পিবিআই জানিয়েছে। মিল্টন এসে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানালেন, ভবানীপুর ব্রিজ এলাকায় গিয়ে স্যুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগে। তখন তিনি ভেতরে কী রয়েছে জানতে চান। মিশন তাকে জানান, স্যুটকেস ও বস্তার ভেতরে তার প্রেমিকা ডলির মরদেহ। এরপর দুজনই ফিরে যান নিজ নিজ বাসায়।
পিবিআই জানায়, মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলে যায় ক্রাইমসিন টিম। সংগ্রহ করা হয় আলামত। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তদন্তের সূত্র গিয়ে ঠেকে ডলির কাছে। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর বিকালে বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মিল্টনকে। পরে একই এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মিশন ও তার মা বানুকে।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার উল্লেখ করেন, মরদেহটি অজ্ঞাত ও পচনশীল হওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের সমন্বিত ব্যবহারে পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের রহস্যও উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
তিনি জানালেন, গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না এবং ঘটনার অন্য কোনো দিক রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।




