বৃষ্টিভেজা শহরে বিদায় নিলেন প্রজ্ঞার বাতিঘর
- অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহে শহীদ মিনার ও অপরাজেয় বাংলায় সর্বস্তরের শ্রদ্ধা

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহে শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। ছবি : আগামীর সময়
সকাল থেকেই আকাশে ছিল বৃষ্টির আগমনি বার্তা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষ হলো, তখনই নামলো ঝুম বৃষ্টি। আজ সোমবার বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সর্বস্তরের মানুষ। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পুষ্পস্তবকে ঢেকে যায় প্রয়াত অধ্যাপকের কফিন।
শহীদ মিনারে বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিতা শারমিন বলেছেন, ‘সবাইকে নিয়ে আমার বাবা কাজ করতে চেয়েছিলেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের যাতে ভালো হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে। তিনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই তার দেখানো সেই আদর্শের পথেই চলব। আপনারা সবাই আমার বাবার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করবেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যকার সামিনা লুৎফা বলেছেন, ‘সন্তানের লাশ সামনে রেখেও প্রতিবাদী হওয়া এই শিক্ষকের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় তার কাছেই সঠিক সমাধান পাওয়া যেত। পদমর্যাদা নির্বিশেষে তিনি সর্বদা মানুষকে যোগ্য সম্মান দিতেন।’
শহীদ মিনারে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, প্রগতি লেখক সংঘ, বাংলাদেশ লেখক শিবির, রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন এবং দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এছাড়া শ্রদ্ধা জানায় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মধ্যে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় গণফ্রন্ট, জেএসডি, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশ গরীব মুক্তি আন্দোলন, সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং সোনার বাংলা পার্টি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান ভাষাবিদ মনসুর মুসা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, অন্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, গবেষক মফিদুল হক, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, মোহাম্মদ সুলতান উদ্দিন, আলমগীর শিকদার লিটন এবং জাহানারা হাকিম বিদ্যানিকেতন ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতিনিধিরা।
শ্রদ্ধা জানাতে এসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেছেন, ‘উনার সঙ্গে আমাদের পথযাত্রা দীর্ঘদিনের। এই পণ্ডিত ও জ্ঞানী মানুষেরা চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা ভাববার বিষয়। ওনাদের বিদায় আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। সমাজ যেন জ্ঞানহীন ও বিবেকহীন না হয়ে যায়, সেটাই এখন মূল শঙ্কা। এই মানুষগুলো যে আদর্শিক সম্পদ রেখে গেছেন, তা ধরে রেখে আমাদের আলো ও বিবেকের চর্চার জায়গাটা আরও বড় করতে হবে।’
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন বলেছেন, ‘অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের চলে যাওয়া আমাদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কখনো ভয় পেয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি, কোনো শক্তিই তার কণ্ঠকে অবদমিত করতে পারেনি। উগ্রবাদীরা তার সন্তানকে হত্যা করার পরও তিনি দমে যাননি। তার লেখনী ও সম্পাদিত পত্রিকার মাধ্যমে তিনি অবিচলভাবে কাজ করে গেছেন।’
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে দুপুরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। সেখানে শ্রদ্ধা জানান পালি ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, কলা অনুষদের ডিন মো. আবুল কালাম সরদার, বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সিরাজ সালেকীন, বাংলা বিভাগের এল্যামনাই অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলা একাডেমিতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল রবিবার দুপুরে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন সমাজ চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।



