‘শিল্পী ভাই’ ও তার পুতুল সংসার

সংগৃহীত ছবি
এক কৃষক বাঁধাকপি লাগিয়েছে। রোজ সে গুনে দেখে কটা কপি বড় হলো। একদিন একটি দুষ্টু ষাঁড় দুটি কপি খেয়ে ফেলল। কৃষক ষাঁড়কে ধরে খুব মারলো, ষাঁড়টি পালিয়ে গেল। ষাঁড়কে খুঁজতে গিয়ে এক সাপ বেরিয়ে পড়লো। সাপ কৃষককে ছোবল মারতে চাইল। তখন ষাঁড় এসে বাঁচালো কৃষককে। ষাঁড় কৃষকের ঋণ শোধ করলো। কৃষক বুঝতে পারলো মানুষ আর পশু একে অপরের সহায়ক। একে অন্যকে সাহায্য করতে পারে।
এমন নানা শিক্ষণীয় পুতুলনাট্যের কাণ্ডারি ছিলেন চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। 'এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার' ছোটদের জন্য পাপেট অ্যানিমেশন ও ফিগার ইত্যাদি মিডিয়া ব্যবহার করে আনন্দঘন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য নানাবিধ গবেষণা এবং অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছে, যা দেশে ও বিদেশে সুনাম অর্জন করে।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এই উদ্যোগের অন্যতম কাণ্ডারি। মূলত তাঁর প্রচেষ্টায় ঐতিহ্যবাহী এই পাপেট মিডিয়া আধুনিক আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। দি রয়্যাল নরওয়েজিয়ান অ্যাম্বাসির আর্থিক সহযোগিতায় এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ইপিডিসি) এর কার্যক্রম সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। বলা যায় দেশের পাপেট শিল্পকলা আন্তর্জাতিক মানে উন্নত হয়।
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের। ‘পাপেটম্যান’ হিসেবে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ারকে ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ আকৃষ্ট করেছিল। তাকেই বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের পুরোধা বলা হয়।
কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ঘুরেছেন। দেশের লোকগাথা, রূপকথা, লোকসঙ্গীত থেকে উপাদান নিয়ে ইপিডিসি বহু অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, প্রযোজনা ও প্রদর্শন করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- পণ্ডিত ও মাঝি, বহুরূপী, প্রবাদ বাক্য, আগাছা, লোড, ষাঁড় ও ড্রাগন, একটি মাত্র, বেড়া, কাঠের পা, গাধা ও কচুরিপানা, আয়না, লিচুচোর, ছোট মেয়ে ও প্রজাপতি, খুকি ও কাঠবিড়ালি, মোমের পুতুল, শান্তির পায়রা ও বকের কান্না ইত্যাদি।
লোভ গল্পে দেখা যায়- বাঘা মেনি দুই বন্ধু নতুন এক রাজ্যে এসেছে। এক সাতরঙা প্রজাপতি মাকড়সার জালে আটকা পড়েছে। বাঘা মেনি প্রজাপতিকে উদ্ধার করলো। এই প্রজাপতি ছিল ইচ্ছাপূরণ পরী। পরী খুশি হয়ে তাদের তিনটি ইচ্ছা প্রকাশ করতে বললো। পরী বলে গেল বেশি লোভ না করে এমন কিছু চাইতে যা দান করলে কমে না, বেড়ে যায়। বাঘা মেনি ভেবে চিন্তে ঠিক করলো, জ্ঞান বিদ্যা আর বুদ্ধিই সব চেয়ে বড় জিনিস। হঠাৎ এক লোভী দৈত্য এল, সে কুপরামর্শ দিয়ে বলল, রাজা হতে চাও, মুকুট চাও, রাজ্য চাও। পরী এস বললো, সব কিছুই নষ্ট হয়, বিদ্যা আর জ্ঞানই সব চেয়ে বড় সম্পদ। বাঘা মেনি লোভকে মেরে দেশ ছাড়া করলো।
‘ফান্দে পড়িয়া বগায় কান্দেরে’ লোক গীতি অবলম্বনে একটি সংগীত মুখর কাহিনী ‘বকের কান্না’। বাংলাদেশের নদীনালা, জলাশয় খুব সুন্দর। কিন্তু এই পরিবেশ আরো সুন্দর হয় যখন এই জলাশয়ে পাখি থাকে, বক থাকে। একজন দুষ্টু লোক বক ধরার ফাঁদ পেতেছে। একটি বক এসে এই ফাঁদে পড়লো, চখা পাখি খবর দিল বক বউকে, বউ উড়ে এল কিন্তু বককে ছাড়াতে পারলো না। একটি ছোট মেয়ে পারুল এসে তাদের বাঁচালো। বাংলাদেশের সংস্কৃতির নানান প্রকাশের মধ্যে পাখির প্রতি ভালোবাসা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পটভূমিকায় এই গল্পটি নির্মিত।
এমন নানা শিক্ষণীয় গল্পে পাপেটের মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের শৈশব রাঙিয়ে দিয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে সংস্কৃতি অঙ্গনে। মুস্তাফা মনোয়ার নতুন কুঁড়ির কারিগরও। আবার টেলিভিশনের পর্দায় ‘রক্তকরবী’ দেখানোর পেছনের মানুষটিও তিনি।
সাত বছর আগে একটি বেসরকারি টেলভিশন স্টেশনে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, “জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।”তিনি মনে করতেন মনের কোনো বয়স নেই।
চলচ্চিত্র নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন মুস্তাফা মনোয়ারের একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘শৈশবে আমার ছবি আঁকার স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিলেন।’
মুস্তাফা মনোয়ারের নেতৃত্বে ইপিডিসি নানাবিধ শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান 'মনের কথা' প্রতি মাসে দুইটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো, যা প্রায় ৬ বছর ধরে চলে। শিশুদের মনে শিল্প সংস্কৃতির বিকাশ ও তাদের নান্দনিক বোধ জাগ্রত করা ও নানানভাবে ছবি আঁকা শেখার একটি সফল অনুষ্ঠানও এটি। ‘মনের কথা’র জন্যও অনেকেই মনে রাখবেন মুস্তাফা মনোয়ারকে।











