হারাল বাংলাদেশ বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে

মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: সংগৃহীত
একুশে পদকপ্রাপ্ত আজ সোমবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে বরেণ্য এ চিত্রশিল্পীর মৃত্যু হয়। মুস্তাফা মনোয়ারের ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল মিয়া জানিয়েছেন এ তথ্য। রুবেল বলেছেন, সকাল সাড়ে ৮টায় মারা গেছেন।
১৪ জুন থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে খ্যাত ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন।
শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী জানান, হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারকে নেওয়া হবে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে শিল্পীকে তাঁর বাসভবনে নেওয়া হবে। তাঁর জানাজা ও দাফন কোথায় হবে, সে বিষয়ে পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হবে।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর ডাকনাম ছিল মন্টু। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা এবং মা জমিলা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাকে হারান। পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
স্কুলজীবনেই বাবার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি শুরু করেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আন্দোলনের পক্ষে কার্টুন আঁকার কারণে প্রায় এক মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল তাঁকে।
ম্যাট্রিকের পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হলেও পরে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৬০ সালে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।
জলরঙে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একবার মন্তব্য করেছিলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্পতেই অনেক কথা বলতে পারে।
১৯৬৫ সালে চারুকলার চাকরি ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, টেলিভিশন বাংলার সংস্কৃতিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন এড়াতে অনুষ্ঠানসূচি মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনায়ও তিনি যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে তাঁর পরিচালনায় প্রচারিত হয় ফজল-এ-খোদার লেখা ও আজাদ রহমানের সুর করা গণসংগীত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে গঠিত সাংস্কৃতিক দলে যুক্ত হয়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন তিনি। পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে আয়োজন করেন পাপেট শো।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। এ কারণেই তিনি ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ নামে পরিচিতি পান। তাঁর সৃষ্ট পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ থেকেই ইউনিসেফের অনুপ্রেরণায় পরে সৃষ্টি হয় বহুল পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর নির্মিত ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানের ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র স্রষ্টাও ছিলেন তিনি। পাশাপাশি ‘মনের কথা’সহ একাধিক প্রশংসিত অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকের টেলিভিশন প্রযোজনাও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। এই দুটি নাটক যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়েছিল।
শুধু শিল্পচর্চাতেই নয়, প্রশাসনিক দায়িত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’-এর নকশা এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপও তাঁরই সৃষ্টি।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া টিভি নাটক, চারুশিল্প, পাপেট নির্মাণ ও শিশু সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিকর্ম এবং শিল্পভাবনা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।







