কোটি শিশুর ‘শিল্পী ভাই’ মুস্তাফা মনোয়ার

সংগৃহীত ছবি
বিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকে যাদের শৈশব কেটেছে, তাদের স্মৃতির ভাঁজে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি আজও উজ্জ্বল। সারা সপ্তাহের স্কুল শেষে টেলিভিশনের সামনে বসার সেই প্রতীক্ষা যেন ছিল ছোট্ট এক উৎসব। আর সেই উৎসবকে আরও রঙিন করে তুলতেন মুস্তাফা মনোয়ার।
তার বিশেষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ ছিল শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়; ছিল একটি প্রজন্মের শৈশব, কল্পনা আর সৃজনশীলতার অনন্য ঠিকানা। সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষার পর অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠত শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আনন্দের মুহূর্ত।
প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার বিকেলে যখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে এই শো-টি শুরু হতো, তখন দেশের কোটি শিশু ড্রয়িংরুমের টিভির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে পড়ত। এই বিকেলটি ছিল শিশুদের নিজস্ব এক জাদুকরী জগৎ।
অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ার নিজেই হাজির হতেন ‘শিল্পী ভাই’ হিসেবে। কাগজের বুকে তুলি আর কালির আঁচড়ে কীভাবে গল্প তৈরি করা যায়, তা তিনি পরম মমতায় শেখাতেন ছোটদের। তার সঙ্গে পর্দায় হাজির হতো তার নিজের হাতে গড়া কালজয়ী পাপেট চরিত্র ‘পারুল’, ‘বাউল ভাই’ আর ‘শার ভাই’। পারুলের মিষ্টি কথা আর বাউল ভাইয়ের একতারার সুর শুক্রবারের সেই অলস বিকেলগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে দিত।
আশির দশকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি টানা ১২ বছর বিটিভির পর্দা কাঁপিয়েছে। শুধু বিনোদন নয়, পাপেটের মাধ্যমে শিশুদের নৈতিকতা, চিত্রকলা এবং লোকজ সংস্কৃতির পাঠ দেওয়ার এমন অনবদ্য প্রয়াস এ দেশে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায়নি।
মুস্তাফা মনোয়ারের দূরদর্শী চিন্তার আর এক অনন্য সৃষ্টি হলো ‘নতুন কুঁড়ি’। বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণের সবচেয়ে সফল ও ঐতিহাসিক রিয়েলিটি শো। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনে এটি ছোট পরিসরে শুরু হলেও, স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের নতুন পরিকল্পনা ও পরিচালনায় এটি এক বিশাল জাতীয় প্রতিযোগিতার রূপ নেয়।
এই অনুষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল তার পিতা, বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’ কবিতার জনপ্রিয় লাইন ‘আমরা নূতন কুঁড়ি, নিখিল ধরায় ফুটিব ফুল হয়ে’ থেকে। কবিতাটির প্রথম ১৫ লাইনই ছিল এই কালজয়ী অনুষ্ঠানের মূল থিম সং।
জাতীয় স্তরের এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তি ও গল্প বলায় পারদর্শী হাজার হাজার সুপ্ত শিশু-শিল্পী নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পায়।
মুস্তাফা মনোয়ারের সুনিপুণ নির্দেশনায় ‘নতুন কুঁড়ি’ কেবল একটি প্রতিযোগিতাই ছিল না, বরং এটি ছিল শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। আজকের বাংলাদেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি জগতের বহু খ্যাতনামা তারকা এবং ব্যক্তিত্বদের শৈশবের প্রথম পথচলা শুরু হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের হাত ধরে তৈরি এই ‘নতুন কুঁড়ি’র মঞ্চ থেকেই।
মুস্তাফা মনোয়ারের জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় বাংলাদেশে পাপেট বা পুতুলনাট্য শিল্প এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যার কারণে তাকে এ দেশের ‘পাপেট ম্যান’ বলা হয়। তিনি কেবল কাঠের পুতুলকে সুতো দিয়ে নাচাতেন না, বরং জড় বস্তুর মধ্যে বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি, রূপকথা ও চিরন্তন আবেগ ঢেলে দিয়ে সেগুলোকে জীবন্ত করে তুলতেন।
১৯৬৬ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হতো তার তৈরি প্রথম কালজয়ী পাপেট শো ‘আজব দেশে’। আপাতদৃষ্টিতে ছোটদের অনুষ্ঠান মনে হলেও, এই শো-এর মূল চরিত্র ‘বাঘা’ (বাঘ) এবং ‘মেনি’ (বিড়াল)-এর বুদ্ধিদীপ্ত ও রসাত্মক কথোপকথনের আড়ালে মুস্তাফা মনোয়ার তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বৈষম্যমূলক নীতি ও দমন-পীড়নকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলতেন।
পাকিস্তানি শাসকদের কড়া নজরদারি এড়িয়ে পাপেটের রূপকের সাহায্যে বাঙালিদের মনে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলতে তিন বছর ধরে চলা ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানটি সে সময় এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেছিল।
মুস্তাফা মনোয়ারের দূরদর্শী চিন্তার এক অনন্য ফসল ছিল ১৯৬০-এর দশকে প্রচারিত লাইভ অনুষ্ঠান ‘ছোটদের আসর’। এটি কেবল একটি সাধারণ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং স্টুডিওতে সরাসরি শিশুদের উপস্থিতিতে গল্প বলা, আঁকাআঁকি এবং বুদ্ধির নানা খেলার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব ভাবনার জগৎকে বিকশিত করার এক অসাধারণ উন্মুক্ত মঞ্চ ছিল।
মুস্তাফা মনোয়ার নিজে এই আসরের মাধ্যমে শিশুদের মাঝে শিল্পকলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার গভীর বীজ বুনে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘নতুন কুঁড়ি’ বা ‘মনের কথা’র মতো ঐতিহাসিক ও কালজয়ী শিশুতোষ অনুষ্ঠানগুলো নির্মাণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুস্তাফা মনোয়ার রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৪ সালে চারুকলা ও পাপেট শিল্পে অনন্য কীর্তির জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’।
এছাড়াও চিত্রশিল্পে তার অনবদ্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাকে সম্মানজনক ‘সুলতান স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয় এবং বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপে ভূষিত করে।
ছাত্রজীবনে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে চিত্রকলায় গোল্ড মেডেল পাওয়ার পাশাপাশি কর্মজীবনে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে শিশুদের মনন গঠনে অবদানের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পাপেট থিয়েটার সোসাইটি তাকে একাধিক আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।
বাঙালির শৈশবকে জাদুকরী রঙে রাঙানো সেই ‘শিল্পী ভাই’ আর কোনোদিন তুলি হাতে পর্দায় ফিরবেন না। কোটি শিশুর প্রিয় পারুল, বাউল ভাই কিংবা বাঘা-মেনির রূপকার, বাংলাদেশের পুতুলনাট্য শিল্পের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার চিরবিদায় নিয়েছেন।
আজ সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৯১ বছর বয়সী এই বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রোস্টেট ক্যানসার ও ফুসফুসের ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ার মতো জটিলতায় ভুগছিলেন।
তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও বিশেষ করে শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তিনি শারীরিকভাবে চলে গেলেও, প্রজন্মের পর প্রজন্মের বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন তার অমর সব সৃষ্টির মাধ্যমে।






