শুভ জন্মদিন র্যাংলার আনন্দমোহন বসু

র্যাংলার আনন্দমোহন বসু
১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আনন্দমোহন বসু। পিতা পদ্মলোচন বসু ও মাতা উমা কিশোরী দেবীর ঘর আলোকিত করে দুর্গম হাওরের বলাকুট নদীর তীরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরবর্তী সময়ে শুধু নিজ পরিবার নয়, ভারতবর্ষের শিক্ষা, রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসকেও আলোকিত করেছিলেন।
আনন্দমোহন বসু ছিলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী প্রথম ভারতীয় বাঙালিদের একজন এবং উপমহাদেশের প্রথম র্যাংলার। ‘র্যাংলার’ বলতে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ট্রাইপস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীকে বোঝানো হয়। সেই কঠিন পরীক্ষায় অসামান্য সাফল্য অর্জন করে আনন্দমোহন বসু ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন আনন্দমোহন বসু। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মেধাতালিকায় নবম স্থান অধিকার করে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ ও বিএ উভয় পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৮৭০ সালে লাভ করেন প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৮৭৮ সালে পাড়ি জমান বিলেতে।
শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ১৮৯৮ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অবিভক্ত ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদ অলংকৃত করেও তিনি থেমে থাকেননি। গণমানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।
আনন্দমোহন বসু ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বোন স্বর্ণপ্রভা দেবীকে বিয়ে করেন। ব্রাহ্ম সমাজের তরুণ সদস্যদের সঙ্গে মতপার্থক্যের পর ১৮৭৮ সালে শিবনাথ শাস্ত্রী, শিবচন্দ্র দেব ও উমেশচন্দ্র দত্তকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৭৯ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি ‘ছাত্রসমাজ’ নামে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের একটি ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রেও আনন্দমোহন বসুর অবদান স্মরণীয়। তিনি কলকাতা সিটি স্কুল ও সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৩ সালে ময়মনসিংহে নিজের বসতবাড়িতে কলকাতা সিটি কলেজের একটি শাখা চালু করেন। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ময়মনসিংহ কলেজিয়েট স্কুল। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯০৬ সালে কলেজ শাখাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. ব্ল্যাকউডের উদ্যোগে কলেজটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আনন্দমোহন বসুর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয় আনন্দমোহন কলেজ। বর্তমানে এটি দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
আনন্দমোহন বসু কলকাতা শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তিনি ইন্ডিয়া সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং শিশির কুমার ঘোষের ইন্ডিয়া লীগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৭৬ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে আজীবন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বঙ্গভঙ্গেরও তিনি ঘোর বিরোধিতা করেন। তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও ফেলো হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মনীষী ১৯০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়িতে তাঁর জীবনের শেষ সময় কাটে। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সময়ের স্রোতে এই কীর্তিমান মানুষটির অবদান অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। জন্মদিন কিংবা মৃত্যুদিনেও তাঁকে স্মরণ করে তেমন কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না। অথচ শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজ সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি দাবি জানাতে চাই। আনন্দমোহন বসুর জন্মভিটা ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের প্রাসাদতুল্য পৈতৃক বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত করে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হোক। ঐতিহাসিক এই বাড়িটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করে সেখানে একটি স্মৃতি জাদুঘর কিংবা গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাড়িটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। কিন্তু এরপর দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শুধু সাইনবোর্ড নয়, আনন্দমোহন বসুর জন্মভিটা রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ।
দেশের শিক্ষা ও রাজনৈতিক ইতিহাসে অসামান্য অবদান রাখা এই মনীষীর জন্মভিটা সংরক্ষণ করা হলে তা শুধু তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তুলে ধরা যাবে বাংলার একজন অসাধারণ শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম।
কলাম লেখক
গাজী মহিবুর রহমান
ই-মেইল: [email protected]



