ঋত্বিক ঘটক
ভাবা প্র্যাকটিস করার সুবর্ণ অধ্যায়

ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর - ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি) আঁকা: ফারজিন জামান খান
‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’র শেষদিকে একটা দৃশ্য— যেখানে ঋত্বিক ঘটক আর অভিনয় করছেন না— তিনি ফ্রেমের ভেতরেই ঢুকে পড়েছেন, নিজের নির্মাণের ভেতরে নিজেই একটা চরিত্র হয়ে— নীলকণ্ঠ বাগচী, মাতাল, ভাঙা, ক্ষয়প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী— চরিত্রটির ভেতর দিয়ে ঘটক নিজের জীবনের ব্যবচ্ছেদ করছেন, আর ক্যামেরা তা রেকর্ড করছে, কোনো রক্ষা নেই, কোনো আত্মপ্রতারণাও নেই, তিনি বোতল ঠোঁটে তুলে বলছেন, এটা অমৃত। তারপর বন থেকে বেরিয়ে আসছেন ভোরের আলোয়, ছেলেকে দেখবেন বলে— আর ঠিক তখনই পুলিশের গুলি এসে তাকে ফেলে দিচ্ছে। মৃত্যুর মুখে পড়েও তিনি জীবনের জয়গান গাইছেন, আর পর্দার বাইরে বসে থাকা আমরা বুঝতে পারছি— এ মানুষটা সিনেমার ভেতরে নিজেকে শেষ করে দিয়ে আমাদের সামনে একটা প্রশ্ন রেখে গেছেন, যা আজও আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।
এ দৃশ্যটি বুঝতে হলে ঋত্বিক ঘটকের জীবনের শুরুর দিকে ফিরে যেতে হয়। ঢাকার জিন্দাবাজারের ঋষিকেশ দাস লেনের ঝুলনবাড়িতে ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর যে শিশুটি জন্ম নিয়েছিল, তার ডাকনাম ছিল ভবা। যমজ বোন প্রতীতির সঙ্গে জন্ম নেওয়া এই শিশুটির ভাগ্যে লেখা ছিল বাংলা চলচ্চিত্রকে এক অকল্পনীয় উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া, আবার একই সঙ্গে সারা জীবন উপেক্ষা, অবহেলা আর ব্যক্তিগত বিধ্বংসতার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া। জন্ম ঢাকায় হলেও তার শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের বড় অংশ কেটেছে রাজশাহীর মিয়াঁপাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে; বাবার বদলির চাকরি শেষে সুরেশ চন্দ্র ঘটক রাজশাহীতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, আর সেই বাড়িতেই ঋত্বিকের প্রথম সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, এমনকি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মঞ্চাভিনয়ের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। এই ভৌগোলিক দ্বৈততা— ঢাকায় জন্ম, রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা— পরবর্তীকালে দেশভাগের রক্তাক্ত বিভীষিকায় যখন উদ্বাস্তু জীবনের বেদনায় রূপ নেবে, তখন তা ঋত্বিকের সমগ্র সৃষ্টিকর্মের কেন্দ্রীয় স্নায়ু হয়ে উঠবে। তার বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, মূলত পাবনার নগরবাড়ি ঘাটের অদূরে ভারেঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পিতামাতার কনিষ্ঠতম নবম সন্তান। অষ্টম শতকের পণ্ডিত ভট্টনারায়ণ ছিলেন তাদের আদি পুরুষ— শাণ্ডিল্য গোত্রীয় এই ব্রাহ্মণ কান্যকুব্জ থেকে আদিশূর আনীত পঞ্চ ব্রাহ্মণের অন্যতম। এই বংশপরিচয়, এই শিকড়ের সন্ধান ঋত্বিকের সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছে— পৌরাণিকতা তার সিনেমায় এসেছে বহুবার, তবে বিশ্বাসের চোখ দিয়ে নয়, শিল্পীর চোখ দিয়ে। তার পরিবার ছিল অসামান্য সৃষ্টিশীলতার আধার: বাবা কবিতা, নাটক লিখতেন, গান গাইতেন; মা ইন্দুবালা দেবী বাজাতেন পিয়ানো। জ্যেষ্ঠভ্রাতা মণীষ ঘটক— ছদ্মনাম যুবনাশ্ব—কল্লোল যুগের অন্যতম প্রধান কবি ও সাহিত্যিক, ইংরেজির অধ্যাপক, সমাজকর্মী; ভারতীয় গণনাট্য সংঘের ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং তেভাগা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মেঝদা সুধীশ ঘটক ছিলেন বিলেতে সিনেমাটোগ্রাফিতে ডিপ্লোমা করা টেলিভিশন এক্সপার্ট, সিনেমায় ক্যামেরাম্যান ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন, বিমল রায় প্রোডাকশনসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সেসবের সুবাদে স্বনামধন্য তাবড় কবি, সাহিত্যিক, সিনেমা পরিচালকের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এ বাড়িতে। অন্যান্য ভাইবোনেরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যশস্বী হয়েছিলেন। একসাথে বেড়ে ওঠা বড়দার মেয়ে সমবয়সী মহাশ্বেতা দেবী হবেন বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক-ঔপন্যাসিক ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী; তার যমজ বোন প্রতীতি দেবীর বিয়ে হবে সর্বপ্রথম পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার দাবি উত্থাপনকারী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্র, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও অভিনেতা সঞ্জীব দত্তের সঙ্গে; তাদের কন্যা এরোমা দত্ত হবেন রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী। কিন্তু এই সুখী, সৃজনশীল পরিবেশের ভেতরেই ঋত্বিক ছিলেন এক ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই তিনি অন্য ধাঁচের মানুষ— আর দশজন লোকের মতো তো ছিলেনই না, আর দশজন বিখ্যাত লোকের মতোও তিনি ছিলেন না। ছেলেবেলা থেকে আমৃত্যু জীবনকে তিনি নিজের মতো করে গড়েছেন, ভেঙেছেন, তারপর আবার নতুন করে গড়েছেন। বাবার বদলির চাকরিসূত্রে স্কুলজীবন শুরু ময়মনসিংহে; বাবা কর্মজীবন শেষে রাজশাহী গিয়ে বাড়ি করে বাস করতে শুরু করলে ঋত্বিকের শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে রাজশাহীতেই। বাড়ি থেকে কয়েকবার পালিয়েছেন; কানপুরে টেক্সটাইল বিভাগে কিছুদিন চাকরিও করেছেন; সর্বশেষ কানপুর থেকে বাড়ির লোকজন ধরে নিয়ে আসেন। মাঝে বছর দুয়েক নষ্ট হয়েছে, এরপর পড়াশোনায় মন আসে। তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন, ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। দেশবিভাগ তথা বাংলা বিভাগে তারা উদ্বাস্তু হয়ে ১৯৪৭-এ পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। ১৯৪৮ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুর কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে বিএ পাস করেন, ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ কোর্স শেষ করেও নাটকের টানে পরীক্ষায় আর বসেননি। এই অস্থিরতা, এই ভবঘুরেপনা তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে; কিন্তু এই অস্থিরতার ভেতর থেকেই জন্ম নেবে এমন এক শিল্পী, যিনি বাংলা সিনেমাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেবেন, যার প্রতিটি ফ্রেমে ধরা পড়বে এক বিচ্ছিন্ন মানুষের আর্তনাদ, এক শিল্পীর প্রতিবাদ, আর এক স্বপ্নদ্রষ্টার আশা।
১৯৪৭-এ রাজশাহীতে প্রকাশিত ‘অভিধারা’ পত্রিকার সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যজীবনের শুরু; পরে কলকাতাতেও তারই সম্পাদনায় অভিধারার কয়েকটি সংখ্যা বেরোয়। ‘দেশ’, ‘অগ্রণী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘নতুন সাহিত্য’ এবং নানা পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয়; ‘গল্পভারতী’তে প্রকাশিত তার প্রথম গল্পে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় তাকে একজন শক্তিমান নবীন লেখক রূপে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতার হাজরা রোডের আট বাই বারো ফিটের একটি চায়ের দোকান— প্যারাডাইস ক্যাফে। এই নোংরা চেয়ার-টেবিলে বসে আড্ডা দিতেন একদল তরুণ— মৃণাল সেন, তাপস সেন, সলীল চৌধুরী আর ঋত্বিক ঘটক। কখনো কখনো আসতেন বিজন ভট্টাচার্য। এখানেই আড্ডা হতো, তর্ক হতো; মধ্যমণি ঋত্বিক। ঋত্বিকের রাজনীতি আর সিনেমার সূতিকাগার এই নোংরা চেয়ার-টেবিলে ঠাসা প্যারাডাইস ক্যাফে; এই তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেপরোয়া ছিলেন ঋত্বিক। তিনি তার সৃষ্টিশীল জীবন শুরু করেছিলেন কবিতা ও গল্প লেখার মাধ্যমে। কিন্তু একসময় তার মনে হলো গণসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে নাটক অধিকতর কার্যকর মাধ্যম। ১৯৪৮ সালে লিখলেন তার প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’।
১৯৫১ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতেও যোগ দেন। বেশ কিছু নাটক লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, অভিনয় করেছেন অনেক নাটকে। ব্রেশট, গোগোল, গোর্কির নাটক অনুবাদ করেছেন। নাটকে মজে গিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেন না। নাটক করতে করতে মনে হলো সিনেমার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ। পরে অবশ্য সিনেমা নিয়েও তার মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছিল; তিনি বলেছিলেন যদি তিনি আরও দশ বছর বাঁচেন এবং তার মধ্যে সিনেমার চাইতেও কোনো শক্তিশালী মাধ্যম জনগণের কাছে যেতে তৈরি হয়, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে তিনি নতুন মাধ্যমটি বেছে নেবেন। এই কথাটিই তার শিল্পীসত্তার মূল চাবিকাঠি— তিনি মাধ্যমের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি, মাধ্যমকে ব্যবহার করেছেন মানুষের কাছে পৌঁছানোর বাহন হিসেবে। যা হোক, সিনেমায় পদার্পণের ক্ষেত্র তো তৈরি হয়েই ছিল— মেজদা সুধীশ ঘটক খ্যাতিমান সিনেমার ক্যামেরাম্যান ও পরিচালকও। ইতিমধ্যে সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্ত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি গঠন করেছেন; কলকাতাসহ চারটি শহরে আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জগদ্বিখ্যাত সিনেমাগুলো দেখানো হলো। এই সিনেমাগুলো দেখার অভিজ্ঞতা ঋত্বিকের চলচ্চিত্রবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক ও অভিনেতাও ছিলেন; এখানেই তার পরিচয় হয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে।
একক পরিচালনায় দেশবিভাগ তথা বাংলা বিভাগ ও ফলশ্রুতিতে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু সমস্যার পটভূমিকায় ১৯৫২ সালে নির্মাণ করেন ‘নাগরিক’। সম্ভবত সেটিই বাংলায় প্রথম আর্ট ফিল্ম। সফদার হাশমী লিখেছেন, ‘পথের পাঁচালি’ দিনের আলো দেখার অন্তত তিন বছর আগেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক সম্পদতুল্য ছবি শেষ করে ফেলেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে চমকে দেওয়া প্রতিভা ঋত্বিক ঘটক। অতীব দুঃখের বিষয়, তার জীবৎকালে সিনেমাটি মুক্তি পায়নি; ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায়, যখন টেকনিক্যাল দিকগুলো প্রায় সব নষ্ট হয়ে যায়। ‘নাগরিক’-এ তিনি প্রথমবার ‘ডিপ ফোকাস’ ব্যবহার করে চরিত্রগুলিকে তাদের সামাজিক পরিবেশে সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করার কৌশল রপ্ত করেন, যা পরে তার শৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। সিনেমার কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্রকে প্রথমবার দেখতে পাই শহর কলকাতার এক বিস্তৃত প্যানোরামিক দৃশ্যের পর: ক্যামেরা প্যান করে দেখাতে থাকে সার দেওয়া ঝুপড়ি ও দোকান, আকাশছোঁয়া বাড়ি ও বস্তি, শহর জুড়ে বৈদ্যুতিক তারের কাটাকুটি এবং দৈনন্দিন কাজে বেরোনো সাধারণ মানুষের ভিড়ে ভরা রাস্তাঘাট। এরপর কমপক্ষে বিশ ফুট উচ্চতা থেকে তোলা একটি লং শটে তিনি মুভির কেন্দ্রীয় চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন— সে ভিড়েরই একজন, তাকে এক বৃদ্ধ মহিলাকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করতে দেখি আমরা। পর্দার এই সাধারণ নাগরিক-নায়ক হেঁটে চলে সংকীর্ণ নোংরা গলি দিয়ে, ভিখারি ও পথশিল্পীদের পাশ দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করতে থাকে ক্যামেরা। এত কিছুর পরে যখন ক্যামেরা নায়কের মুখের ওপর এসে স্থির হয়, ততক্ষণে দর্শকরা তাকে নিজেদেরই একজন হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেছেন। ঋত্বিক আসলে এক জনপ্রিয় এবং অধঃপতিত চলচ্চিত্ররীতিকে সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করছেন— সেই রীতি, যার বৈশিষ্ট্য হলো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে একজন অনন্যসাধারণ ব্যক্তি, যিনি ভাগ্যবিপর্যয়ের শিকার হবেন। তার সমস্ত চরিত্র তথা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য—তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকেই পর্দায় তুলে এনেছেন, তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের সংগ্রাম, তাদের বেঁচে থাকার লড়াই।
১৯৫৫ সালে আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে ডকুমেন্টারি ছবি করলেন ‘ওঁরাও’। এ বছরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন— নিজস্ব চিন্তাধারার থিসিস লেখা ও বিতরণের কারণে; এই বহিষ্কার তার রাজনৈতিক জীবনের একটি স্পষ্ট মোড়, যার পর থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তার চলচ্চিত্রজীবনে প্রবেশ করে। মাঝে কিছু সময়ের জন্য ঋত্বিক বোম্বে যান এবং দুই বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক বিমল রায় ও ঋষিকেশ মুখার্জির পরিচালনায় ও দিলীপ কুমার অভিনীত ‘মধুমতী’ ও ‘মুসাফির’-এর হিন্দি চিত্রনাট্য লেখেন। ‘মধুমতী’ (১৯৫৮) ছিল তার লেখা একমাত্র বড় বাণিজ্যিক সাফল্য— সিনেমাটি সেই বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্র হয়ে বিমল রায় প্রোডাকশনসকে আর্থিক সংকট থেকে টেনে তোলে, এবং পুনর্জন্ম থিম নিয়ে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে ওঠে; পরবর্তীকালে ‘কারজ’ (১৯৮০) ও ‘ওম শান্তি ওম’ (২০০৭)-এর মতো সিনেমায় এর স্পষ্ট ছায়া পড়ে। কিন্তু অর্থ তাকে কখনো বাঁধতে পারেনি। স্ত্রী সুরমাকে লেখেন, ‘দশটা পাঁচটা গিয়ে বসে থাকতে হবে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু পয়সার চেষ্টা করা। দেখ লক্ষ্মী, এ জীবন আমাদের নয়...। এ সব ছেড়ে দেব। এ হবে না।’ তিনি কলকাতা ফিরে আসেন। এরপর ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ‘অযান্ত্রিক’। এই সিনেমার জন্য তিনি প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন; কেবল ছয় থেকে সাতবার স্ক্রিপ্টই বদলেছেন। সুবোধ ঘোষের একই নামের ছোট গল্প থেকে নির্মিত এই সিনেমায় নায়িকা একটি লক্কড় ট্যাক্সি ‘জগদ্দল’, নায়ক ড্রাইভার বিমল চরিত্রে কালী ব্যানার্জি। ট্যাক্সিটির সঙ্গে বিমলের যে কথাবার্তা, মনে হয় যেন সত্যিকার দুজন মানুষের মধ্যে ভাব বিনিময় হচ্ছে— মান, অভিমান, ভালোবাসা সবকিছু। ঋত্বিক জগদ্দলকে অনুভূতিপ্রবণ এক সত্তা হিসেবে কল্পনা করে, তার মধ্যে মানবিক প্রতিক্রিয়া আরোপ করে সে যুগের দর্শকের কাছে উপস্থাপনের সাহস দেখিয়েছেন। মানুষ এবং যন্ত্রের ভালোবাসার এই গল্পে তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলেছেন এক পরাবাস্তব কাহিনি। ১৯৫৯ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘অযান্ত্রিক’ প্রদর্শিত হয়; অনেকে মনে করেন ১৯৬২-তে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ ও ১৯৭৬ সালে মার্টিন স্করসেস নির্মিত ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’— এ দুটি সিনেমায় বেশ প্রভাব রয়েছে ঋত্বিকের ‘অযান্ত্রিক’-এর। নাগরিকের ব্যর্থতার পর মুষড়ে যাওয়া ঋত্বিককে খ্যাতি এনে দিল ‘অযান্ত্রিক’। এর পরপরই তার আর একটি সিনেমা ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯)— বাড়ি থেকে পালানো এক ছেলের চোখে শহরকে দেখার গল্প; নাকি ঋত্বিকের নিজেরই গল্প এটি, তিনি তো নিজেও কয়েকবার পালিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। গ্রামের ছেলে কাঞ্চন কলকাতায় এসে দেখে উঁচু উঁচু বাড়ি আর তার ঠিক পাশেই নোংরা বস্তি; এ শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য এভাবেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ঋত্বিক। এই বছরেরই আরেকটি অসমাপ্ত কাজ হলো ‘কতো অজানারে’— শঙ্করের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার শুটিং প্রায় সম্পূর্ণ হলেও আদালতের দৃশ্যটি বাকি থাকে; আর্থিক ও অন্যান্য সমস্যায় এটি অসমাপ্ত থেকে যায়, পরে সাতটি রিল পুনরুদ্ধার করা হয়।
এরপর ১৯৬০, ’৬১ ও ’৬২-তে তিনটি সিনেমা— ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’; এ তিনটিকে ত্রয়ী ধরা হয় এবং দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুদের অস্তিত্বের সংকট, হাজারো সমস্যাসংকুল ও মনোজাগতিক জটিল পরিস্থিতি এবং অবক্ষয়ই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ শক্তিপদ রাজগুরুর ‘চেনামুখ’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এবং বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে; শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন, বাংলা সিনেমায় এর স্থান সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’র পরেই। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ Sight & Sound-এর ২০২২ সালের সমালোচকদের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র জরিপে ২৩১ নম্বরে স্থান পায়— যদিও এই জরিপের পদ্ধতি ও তালিকা নিয়ে সমালোচনা আছে, তবু এই স্বীকৃতি বাংলা সিনেমার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বড় সাক্ষ্য। এ সিনেমার একেবারে শেষের দিকে নায়িকা নীতার (সুপ্রিয়া দেবী) বড়দা শঙ্করের (অনিল চ্যাটার্জি) উদ্দেশ্যে ডায়ালগ— ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম। দাদা, আমি বাঁচতে চাই’— ক্লাসিক ডায়ালগ হয়ে আছে। এই সিনেমায় ঋত্বিক প্রথম রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করেছেন; আবহসংগীতে রাগ ও রাগাশ্রয়ী খেয়াল ব্যবহার করেছেন। ‘কোমল গান্ধার’-এ ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’ গানটির পিকচারাইজেশন দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে—সুপ্রিয়া দেবী পাহাড়ের পাদদেশে বসে আছেন আর অনিল চ্যাটার্জি চোখেমুখে দুহাতে আনন্দের দারুণ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে গানটির অন্তর্নিহিত মানবজন্মের জয়গান গেয়ে হেলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে তাকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। ‘সুবর্ণরেখা’য় সীতা তার শিশুসন্তানকে বাঁচাতে বেছে নেয় অন্ধকার জগৎকে। কিন্তু ‘কোমল গান্ধার’ ও বিশেষত ‘সুবর্ণরেখা’ একেবারেই মার খায়— কেন যে বাঙালি সিনেমা দুটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল! ‘সুবর্ণরেখা’ মুক্তির আগে তিন বছর ধরে পড়ে ছিল; প্রযোজক ও পরিবেশগত জটিলতায় সিনেমাটি আটকে থাকে, এই বিলম্ব তার মানসিক ভাঙনের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি এমনভাবে মুষড়ে পড়েন যে, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর আগে আর কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা করেননি। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। পাতার বিড়ি আগেই খেতেন, নতুন করে প্রচণ্ডভাবে ধরলেন বাংলা মদ। ১৯৬৫ সালের দিকে স্নান করা ছেড়ে দিলেন। নিজের সমস্ত ব্যবহারে তিনি প্রচণ্ড একগুয়েমিভাবে অচঞ্চল। তার অত্যন্ত ‘লক্ষ্মী’ স্ত্রী সুরমা ঘটক— যিনি নিজেও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন— সন্তানদের নিয়ে শিলং চলে গেলেন; বরং তিন সন্তানের কথা চিন্তা করে ঋত্বিককে তার নিজের মতো করে থাকতে দিয়ে গেলেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উশকোখুশকো চুল, মলিন পাঞ্জাবি-পাজামা, ঠোঁটে বিড়ি, হাতে বাংলা মদের বোতল, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে ট্রেডমার্ক ঋত্বিক হয়ে গেলেন। সিজোফ্রেনিয়াতেও আক্রান্ত হন। স্পষ্টভাষী, ঠোঁটকাটা নিজের পরিচয় দিতেন ‘মাতাল বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’ বলে। এমন গল্প আছে, হয়তো রাতে বাড়ি ফিরছেন, মাতাল অবস্থায় পা চলছে না; ট্যাক্সি নিলেন। বাড়ি এসে ভাড়া দিতে গিয়ে বললেন ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে গিয়ে কলিং বেল টিপলে একজন ঢ্যাঙা লোক বেরিয়ে আসবেন, তাকে বলবেন ঋত্বিক ঘটক ভাড়া দিতে পারেনি, আপনাকে দিতে বলেছেন। সেই ঢ্যাঙা লোকটি সত্যজিৎ রায়— অনেকবার সত্যজিৎ এভাবে নাকি ঋত্বিকের ট্যাক্সিভাড়া পরিশোধ করেছেন।
১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত তিনি পুনের ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (FTII, Pune) ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেন; কিছুকাল ছিলেন উপাধ্যক্ষও। এ শিক্ষকতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়— এটি পুনের FTII, এই তথ্যটি স্পষ্ট রাখা দরকার। এই স্বল্পকালীন শিক্ষকতায় এতই আনন্দ পেয়েছেন ও গুরুত্ব দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন, অল্প কয়েকটি সিনেমা তিনি নির্মাণ করেছেন তা যদি দাঁড়িপাল্লার একদিকে তোলা হয় এবং ওই শিক্ষকতাকে অপর পাল্লায় তোলা হয়, তাহলে শিক্ষকতার পাল্লা ভারী হবে। সেখানে তার ছাত্র ছিলেন কুমার শাহানি, মণি কৌলের মতো পরবর্তীতে খ্যাতিমান নির্মাতারা, যারা ঋত্বিকের শিক্ষাদানের সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এই তালিকা আরও দীর্ঘ— এর মধ্যে রয়েছেন আদুর গোপালকৃষ্ণন, জন আব্রাহাম, সইদ আখতার মির্জা, সুভাষ ঘাই এবং বিধু বিনোদ চোপড়ার মতো পরিচালকরা। এ সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি ডকুমেন্টারি ও শর্টফিল্মও করেছেন। ১৯৬৫-তে লেখেন ‘পণ্ডিতমশাই’ নামে একটি বড়ো গল্প, যা অযত্নে-অবহেলায় উইপোকায় কাটে; এই গল্প থেকে তিনি ‘জন্মভূমি’ নামে যে চিত্রনাট্যটি করেন, তা ১৯৬৮-তে অভিনয়-দর্পণে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে; তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, যিনি ঋত্বিকের গুণমুগ্ধ ছিলেন। কিন্তু স্বীকৃতি বা সম্মানের তিনি কাঙ্গাল ছিলেন না, বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ সেদিকে কখনো করেননি; শিল্পের দাসত্বই করে গেছেন। তার চলচ্চিত্র-তত্ত্ব ও প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকারের সংকলন ‘Cinema and I’ সম্পর্কেও এখানে বলা দরকার— এ বইটিকে সত্যজিৎ রায় ‘চলচ্চিত্র নির্মাণের সব দিক’ আলোকপাতকারী গ্রন্থ বলে অভিহিত করেছেন। ঘটকের তাত্ত্বিক চিন্তা তার চলচ্চিত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সংকলনটি তার চলচ্চিত্র-দর্শনের কেন্দ্রীয় দলিল। এই বইয়ে তিনি সিনেমার ভাষা, শব্দের ব্যবহার, দ্বান্দ্বিক বিন্যাস ও দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তা পরবর্তী বহু চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক ও নির্মাতাকে প্রভাবিত করেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ শর্টফিল্মটি করেন এবং কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ করেছেন। এখানে একটি মর্মান্তিক তথ্য যোগ করা দরকার: তার সারা চলচ্চিত্রজীবনে পাকিস্তানে ভারতীয় সিনেমার সাধারণ নিষেধাজ্ঞা ছিল, ফলে তার জন্মভূমি ঢাকায় (তখন পূর্ব পাকিস্তান) তার সিনেমা কখনো প্রদর্শিত হয়নি। দেশভাগের বেদনা তার সৃষ্টিতে যে কেন এত গভীর, এই তথ্য তা আরও স্পষ্ট করে। ১৯৭৩ সালে দীর্ঘদিন পর নির্মাণ করেন অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নিয়ে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র। তিনি বলেছেন, তিনি ছাড়া তিতাস হতো না; তার মতো মমত্ব নিয়ে আর কেউ এই কাহিনি তুলে ধরতে আগ্রহী হতেন না। এটি ছিল তার স্বপ্ন। ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ যেখানে মরতে বসা তিতাস নদীর নৈরাশ্য দেখিয়েছেন, ঋত্বিক সেখানে আশার আলো দেখিয়েছেন; তার মতে শিল্প মানেই লড়াই, সংগ্রাম— তিনি পুনরুজ্জীবন দেখিয়েছেন। তাই তিতাসের শেষ দৃশ্যে দেখিয়েছেন— চরে গজিয়ে ওঠা নতুন ঘাসের মধ্যে ভেঁপু বাজাতে বাজাতে একটি শিশু ছুটে আসছে—বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ করেন সিনেমা। এর জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান পান (১৯৭৩-৭৪)। সিনেমাটি ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে সেরা ১০টি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে এবং ২০১০ সালে ৬৩তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের ক্লাসিক বিভাগে প্রদর্শিত হয়। ছেলেবেলায় ব্রহ্মপুত্র দেখেছেন ঋত্বিক, বাবার চাকরি তখন ময়মনসিংহে; আরও বড় হয়ে চষে বেড়িয়েছেন পদ্মার পাড়; নদীর পাড়ের জীবন তিনি দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। সেজন্যই বোধহয় এত স্পষ্ট প্রতিবিম্বে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন নদীপাড়ের গল্প। আবার তিতাসপাড়ের অনন্তের মতো তাকেও চলে যেতে হয়েছে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে দূরে, বহুদূরে; এ সিনেমার শুটিং হয় বাংলাদেশে।
তার শেষ সিনেমা, আত্মজৈবনিক ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ১৯৭৪ সালের; মাত্র দুদিনে এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন নিজে। তার নির্মিত তিনটি সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন— ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। শেষটিতে তিনি মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচীর চরিত্রে, যিনি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য বিক্রি হননি। ১৯৭১-৭২ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন কাউকে তুষ্ট না করে; একদিকে নকশাল আন্দোলনের অভিঘাত, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শরণার্থীর ঢল ও তার অভিঘাত। মৃণাল সেনও ‘কলকাতা ৭১’-এ তুলে ধরেছেন সে সময়ের বাস্তবতা। ঋত্বিকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ সম্ভবত তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি; এমন নির্মমভাবে আত্মবিশ্লেষণ, নিজেকে শবব্যবচ্ছেদ করা সহজ নয় মোটেই। কমিউনিজম সম্পর্কে নিজস্ব চিন্তাধারার থিসিস লেখা ও বিতরণের জন্য পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন (শোনা যায় জ্যোতি বসু তার পক্ষে ছিলেন অবশ্য), আজীবন তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন; দ্বান্দ্বিকতা তিনি এই আত্মজৈবনিক সিনেমায় প্রবলভাবে ব্যবহার করেছেন, রূপক ব্যবহার করেছেন অসংখ্য। চরিত্রের নামগুলিও রূপক— নীলকণ্ঠ, দুর্গা, নচিকেতা, বঙ্গবালা প্রভৃতি। নকশালরা যখন দাবি করল যে তিনি ক্ষয়প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী, অকপটে স্বীকার করে বললেন ‘ধরে ফেলেছ?’ এতে তিনি প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রধান চরিত্রাভিনেতা— সম্ভবত পৃথিবীতে এর নজির নেই। এ মুভিতেও একটি রবীন্দ্রনাথের গান ছিল, দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’; মা সেখানে বঙ্গবালা চরিত্রে শাঁওলি মিত্র— রূপক অর্থে পূর্ববঙ্গ; ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বঙ্গবালা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে। এর জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনি’ বিভাগে পুরস্কৃত হন— এটি ‘শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ বা ‘শ্রেষ্ঠ পরিচালক’ বিভাগ নয়, এই স্পষ্টতাটুকু মনে রাখা দরকার।
এখানে ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি বোঝার জন্য একটি জরুরি তথ্য যোগ করা দরকার: শুধু মুক্তিপ্রাপ্ত আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাই নয়, তিনি রেখে গেছেন চারটি অসমাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তিনটি অসমাপ্ত ডকুমেন্টারি, সাতটি চিত্রনাট্য (যা পরে অন্যরা পরিচালনা করেন) এবং কমপক্ষে বিশটি চিত্রনাট্য বা খসড়া চিত্রনাট্য যা কখনো ফিল্ম হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ‘রঙের গোলাম’ (সুচিত্রা সেন অভিনয়ের কথা ছিল), ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ (তার একমাত্র কমেডি) এবং রামকিঙ্কর বাঁইজের অসমাপ্ত তথ্যচিত্র। এই অসমাপ্ত কাজগুলোই প্রমাণ করে, তার সৃষ্টিশীলতার আসল পরিধি কেবল আটটি মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রতিকূল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, অর্থাভাব ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্যেও তিনি একের পর এক পরিকল্পনা করে গেছেন, যার বড় অংশ শেষ করার সুযোগ তিনি পাননি। ১৯৭৪ সালে অসুস্থতা এবং পরপর নার্ভাস ব্রেকডাউনের মধ্যেই তিনি তার অন্তিম সিনেমা শেষ করেন; চলচ্চিত্রের যে ভাষা ও ব্যাকরণ তিনি এতদিন ধরে রপ্ত করেছিলেন, শেষ সিনেমায় এসে তিনি সেই ভাষা ও ব্যাকরণকেই চরম দুঃসাহসভরে নাকচ করে দিলেন। চরিত্রগুলো যেন পর্দা থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি কথা বলে, তাদের জবাব না দিয়ে উপায় নেই।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫ মিনিটে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আজন্ম ভবঘুরে ভবা। মৃত্যুর সময় স্ত্রী সুরমাও ছিলেন বহু দূরে; মৃণাল সেন সুরমা ঘটককে খবর পাঠালেন, ‘Ritwik Ghatak expired’। মৃণাল সেনের ভাষায়, ‘শেষ কটা বছর ঋত্বিকের বেঁচে থাকাটাই একটা বিরাট অঘটন।’ তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যায়, তিনি যক্ষ্মা ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কলকাতার মানুষ তার মৃত্যুতে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে— দুপুরের মধ্যেই প্রেসিডেন্সি গভর্নমেন্ট হসপিটালের গেটে জড়ো হন শয়ে শয়ে নানান গোষ্ঠী ও বৃত্তির মানুষ; বিকালে শেষকৃত্যের যাত্রায় হাজারে হাজারে লোক কেওড়াতলা শ্মশান পর্যন্ত হেঁটে যান, তাদের কণ্ঠে বেজেছিল তার সবচেয়ে প্রিয় কয়েকটি গান। জীবদ্দশায় প্রাপ্য সম্মান বা ভালোবাসা তিনি পাননি; সফদার হাশমী লিখেছেন, তিনি বুর্জোয়া সমালোচকদের অবহেলা পেলেন জীবনভর, প্রতিষ্ঠান তাড়িয়ে বেড়াল তাকে, চলচ্চিত্রশিল্পের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাব্যক্তিরা নিংড়ে নিল। ‘সেই ঋত্বিক’ বইয়ে লিখতে গিয়ে বোন প্রতীতি দেবী লিখেছেন, ‘শুনেছি পরবর্তী জীবনে (ঋত্বিককে) খেতে দেওয়া হত না বা পেত না— আমার মা-বাবার সৌভাগ্য, সে দৃশ্য দেখতে হয়নি।’ তবু সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে একজন খাঁটি শিল্পীর মতোই নিবিষ্ট মনে নির্মাণ করে গেছেন একের পর এক সিনেমা।
মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তার কাজ পুনরাবিষ্কৃত হতে থাকে; এই পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়রেখা আছে। ১৯৮২ সালে তার কন্যা সমহিতা ঘটক ‘ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০-এর দশক থেকে পদ্ধতিগতভাবে তার সিনেমা পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে সিনেমায়া জরিপে ‘সুবর্ণরেখা’ ১১ নম্বরে স্থান পায় এবং ২০০২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড জরিপে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ২৩১ নম্বরে। এই সময়রেখা দেখায় যে, স্বীকৃতি কত দেরিতে এবং ধীরে এসেছে। ঘটকের উত্তরাধিকার পরিবারের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয়েছে— তার পুত্র ঋতবান ঘটক নিজেও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি পিতার অসমাপ্ত কাজ পুনরুদ্ধার ও সম্পূর্ণ করতে কাজ করেছেন; কন্যা সমহিতা ঘটক এনএফএআইতে পিতার অসমাপ্ত সিনেমা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। ২০২৫ সালে তার জন্মশতবর্ষে এনএফডিসি-এনএফএআই জাতীয় চলচ্চিত্র ঐতিহ্য মিশনের অধীনে তার আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাসহ সমগ্র চলচ্চিত্রকর্মের অভূতপূর্ব ডিজিটাল সংরক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে; এগুলো ফোর কে রিস্টোর করা হয়েছে এবং বিএফআই সাউথব্যাংক লন্ডনে একটি পূর্ণাঙ্গ রেট্রোস্পেক্টিভ আয়োজন করা হয়েছে। জনগণের দাবিতে তার সিনেমা আবার নতুন করে আলোচিত হয়। বাংলা চলচ্চিত্রে ঋত্বিকের অবস্থান সুউচ্চে, কারণ তিনি কেবল সিনেমা বানাননি—তিনি সিনেমার ভাষাকে নতুন করে ভেবেছেন, বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও নাট্যধারাকে সেলুলয়েডে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে শিল্পের অমর বিষয়বস্তুতে রূপান্তরিত করেছেন। তার মতো শিল্পীরা উল্কার মতো আসেন— স্বল্পক্ষণ আলো ছড়িয়ে চিরতরে হারিয়ে যান, কিন্তু তাদের সৃষ্টিকর্ম অমর হয়ে থাকে। বাংলা সিনেমাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার অন্যতম এই কিংবদন্তি শিল্পস্রষ্টার মৃত্যুর কাছে অকালে এ করুণ পরাজয়ে আমাদের অন্তত একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস তার স্মৃতির প্রাপ্য। আর যদি ভালো সমাজসচেতন, ভাবনা-উদ্রেকমূলক সিনেমা দেখতে চান, আগে না দেখে থাকলে ঋত্বিক ঘটকের সবকটি সিনেমা দেখুন— তবে একটি কথা অনস্বীকার্য, তার সৃষ্টির স্বাদ পেতে হলে বিশেষত উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে নির্মিত দেশ ও বাংলা বিভাগের সৃষ্ট উদ্বাস্তু সমস্যা বোঝার মন থাকতে হবে। কারণ ঋত্বিকের সিনেমা শুধু দেখার বিষয় নয়, অনুভব করার বিষয়— তার প্রতিটি ফ্রেমে ধরা পড়ে এক বিচ্ছিন্ন মানুষের আর্তনাদ, এক শিল্পীর প্রতিবাদ, আর এক স্বপ্নদ্রষ্টার আশা।













