স্মরণে গগন ঠাকুর
আলোর তলার অন্ধকারে লীন হয়ে যাওয়া আলো

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে গগন ঠাকুর (১৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৬৭ - ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৮)
শিল্পকলার জগতে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে গগন ঠাকুর চিরকাল একটু আড়ালেই রয়ে গেলেন! খানিকটা তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যে, খানিকটা সমকালীন ও পরবর্তী শিল্প-গবেষকদের ঔদাসীন্যে। আর একটা বড় কারণ নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথের যৌথ গরিমার আলো। অথচ চিত্রকলার চৌহদ্দিতে তার ভিন্ন সাধনার দীপ্তি সহজেই চোখে পড়ে। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রকর, কার্টুনিস্ট, মঞ্চাভিনেতা, শিল্পরসিক এবং আলো-আঁধারের এক আশ্চর্য জাদুকর।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মেছিলেন ১৮৬৭ সালে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে— কোনও সূত্রে ১৭ সেপ্টেম্বর, কোনও সূত্রে ১৮ সেপ্টেম্বর। মৃত্যু ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮। তাকে বলা হয় ঊনবিংশ-বিংশ শতকের ঔপনিবেশিক ভারতের প্রথম কার্টুনিস্ট। আধুনিক ভারতীয় শিল্পের নানা দিকে তাকে পথিকৃৎ বলা যায়। প্রথাগত শিক্ষা না পেলেও ব্রিটিশ স্কুলের জলরঙ শিল্পী হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯০৬ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে জাপানি ব্রাশ technique এবং সুদূর প্রাচ্যের pictorial conventions আত্মস্থ করেন; ১৯১০ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত কালো কালিতে নিজস্ব পদ্ধতি গড়ে তোলেন। ঔপনিবেশিকতা বিরোধী হয়েও পাশ্চাত্য প্রভাবের প্রতি তিনি মুক্তপ্রাণ ছিলেন বলা যায়।
তার কাজকে পাঁচটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব (১৯০৫-১৯১১): কলকাতার দৃশ্য, পুরীর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও প্রতিকৃতি। দ্বিতীয় পর্ব (১৯১১-১৯১৫): চৈতন্য-ভাবের ছবি— চৈতন্য ও তার ভক্তদের ছবি এবং তীর্থযাত্রীদের চিত্র। তৃতীয় পর্ব (১৯১৫-১৯২১): বিচিত্রা পর্ব, যেখানে অধিকাংশ ব্যঙ্গচিত্র ও হিমালয়ের ছবি। চতুর্থ পর্ব (১৯২১-১৯২৫): কিউবিস্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পঞ্চম পর্ব (১৯২৫-১৯৩০): কিউবিস্ট-উত্তর ছবি। ১৯০৭ সালে ভাই অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে জোড়াসাঁকোর ৫ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে গড়ে ওঠে ‘বিচিত্রা’ ক্লাব, যেখানে নন্দলাল বসু, অসিত হালদার, মুকুল দে, সুরেন কার প্রমুখ শিল্পী যুক্ত ছিলেন। চিত্রকলা, সংগীত, সাহিত্য— সব মিলিয়ে সেই ক্লাব ছিল কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তার চিত্রকলা ১৯১৪ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে প্যারিস, লন্ডন, হামবুর্গ, বার্লিন ও আমেরিকার কয়েকটি শহরে প্রদর্শিত হয় এবং কঠোর সমালোচকদেরও প্রশংসা অর্জন করে। তিনি বহুবার রবীন্দ্রনাথের নাটকের আলোকশিল্পী হিসেবেও কাজ করেছেন।
বাংলায় কার্টুনের ইতিহাস বেশ পুরনো। ঊনবিংশ শতকে কালীঘাটের ছবি দিয়ে বাংলার শিল্পের সূচনা। পটুয়ারা পটে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ছবি আঁকতেন; পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে অনেকেই ‘কোম্পানি পেইন্টার’ হয়ে যান, যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ব্রিটিশরা। ১৮৬০ ও ৭০-এর দশকে বাটতলা প্রেস ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা ও তাদের ভারতীয় মিত্রদের ব্যঙ্গ করে নিজস্ব প্রকাশনা শুরু করে। ‘বাবু’ নামে পরিচিত এক স্বতন্ত্র শ্রেণির ভণ্ডামি ছিল তাদের প্রধান বিষয়। ব্রিটিশ রাজের অধীনে গড়ে ওঠা এই শ্রেণি তাদের ভাগ্যের জন্য প্রশংসিত হলেও বিলাসী জীবনযাত্রার জন্য উপহাসিত হত। ১৮৭২ সালে একটি বাংলা সংবাদপত্রে কার্টুন প্রকাশিত হলে তুমুল হুলুস্থুল পড়ে যায়। ১৮৭৪ সালের মধ্যে ‘হরবোলা ভান্ড’ ও ‘বসন্তক’ নামে দুটি কার্টুন ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে শুরু করে, যাদের ‘ভারতীয় পাঞ্চ’ বলা হত। কাঠের ব্লকে তৈরি এই কার্টুনগুলি বাটতলা ও কালীঘাটের আঁকার ধারা দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিল। ঊনবিংশ শতকের ৫০ ও ৬০-এর দশকে ‘পাঞ্চ’ ম্যাগাজিন ঔপনিবেশিক বিশ্বে ঝড় তুলেছিল এবং বাংলা কার্টুনকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে ধরা হয়।
এই ধারাকে আধুনিক রূপ দেন গগনেন্দ্রনাথ। ১৯১৭ সালের পর তিনি তিনটি বই প্রকাশ করেন— ’নব হুল্লোড়’, ‘অদ্ভুতলোক’ এবং ‘বিরূপ বজ্র’। ‘অদ্ভুতলোক’ নামটিই বলে দেয়, তিনি সমাজের অদ্ভুততা, অসংগতি ও ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করছেন। তার লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা অনুকরণে গড়া মধ্যবিত্ত বাবু, ধনী ব্রাহ্মণ, পুরোহিততন্ত্র আর উপনিবেশিক মানসিকতা। এই পোর্টফোলিওগুলি অত্যন্ত বিরল; অল্প দামে প্রকাশিত হওয়ায় দ্রুত বাংলার পুরনো স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। ‘বিরূপ বজ্র’-এর ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘যখন বিকৃতি অবাধে বাড়ে, আর অন্ধ অভ্যাসে তা লালিত হয়, তখন শিল্পীর কর্তব্য দেখানো যে তা কুৎসিত, অশ্লীল এবং অস্বাভাবিক।’ এই কথাটিই তার শিল্পের মূল মন্ত্র। তিনি নিজে জমিদার পরিবারের সন্তান, তবু ভারতের শিল্পোদ্যোগের যুগে বড় হয়েছেন— এই দ্বৈততা তার সৃষ্টিশীলতায় গভীর ছাপ ফেলেছে। স্বদেশি আন্দোলনের আবহও তার কার্টুনে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘গোবর দিয়ে শোধন’ (১৯১৭) ছবিতে চন্দনের ফোঁটা মাখা এক পুরোহিত তিনজন নারীর ওপর পবিত্র জল ছিটিয়ে দিচ্ছেন, ডান হাতে ধরা টাকার থলি— যার গায়ে লেখা ‘টঙ্ক দেবী’। ধর্মের আড়ালে লোভ, শাস্ত্রের আড়ালে শোষণ— এই ব্যঙ্গ আজও প্রাসঙ্গিক।
‘ধারণার গোলমাল’ (Confusion of Ideas, ১৯১৭) ছবিতে পাশ্চাত্য পোশাকে সাজা কিছু বাবু দেবতার সামনে প্রণাম করছেন; একজনের পকেট থেকে মুরগির ছানা উঁকি দিচ্ছে— হিন্দু নিরামিষভোজীর কাছে নিষিদ্ধ; আরেকজন সোলা হ্যাট নামিয়ে প্রণাম করছেন, হাতে ধরা সিগারেট। এ যেন দুই সংস্কৃতির দোলাচলে পড়া এক হাইব্রিড মধ্যবিত্তের ছবি।
‘Nuisance of a Wife’ ছবিতে এক মোটা বাবু ধুতি-কুর্তা পরে সামনে হাঁটছেন, পিছনে তার স্ত্রী একহাতে মালপত্র, অন্য হাতে কাঁদছে শিশু— স্বামী ফিরেও তাকাচ্ছেন না। পাশ দিয়ে যাচ্ছে ইংরেজি পোশাক পরা এক দম্পতি; স্ত্রীর কোমরে হাত, গলায় গয়না, মেয়ের ফ্রক ও জুতো। গগনেন্দ্রনাথ এখানে দু’ধরনের নারীর চিত্র তুলে ধরেছেন— একজন বিনত, বোঝা বইতে বইতে নিঃশেষ; অন্যজন আত্মবিশ্বাসী, এমনকি প্রভুত্বকারী। ব্যঙ্গটা কেবল পুরুষতন্ত্রের ওপর নয়, উভয় চরমের ওপরই।
কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ কেবল ব্যঙ্গচিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তার ‘প্রতিমা বিসর্জন’ ছবিটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৯১৫ সালে আঁকা, প্রকাশিত ১৯২২ সালে; রক্ষিত আছে রবীন্দ্রভারতী সোসাইটিতে। ‘ঠাকুরবাড়ির চিত্রকলা’ গ্রন্থে এর একটি বিবর্ণ প্রিন্ট ছাপা আছে। মূল ছবি না দেখে শুধু প্রিন্ট দেখে বিচার ঝুঁকিপূর্ণ, তবু ছবিটির গঠনই এতটা কথা বলে যে তা নিয়ে ভাবতে হয়। ছবিটি উল্লম্বভাবে তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তরে মাটি, জনতা এবং দেবীমূর্তি— অন্ধকার থেকে আলোর বৃত্তে গড়া অবয়ব। দ্বিতীয় স্তরে আধো আলো-আঁধারিতে দোতলা-তেতলা বাড়ি, বারান্দায় দাঁড়ানো নারীমূর্তি। তৃতীয় স্তরে চাঁদ-সহ আকাশ। এই আলো-আঁধারের নির্মাণই গগনেন্দ্রনাথের নিজস্ব টিপছাপ।
পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সম্মিলনে এখানে তৃতীয় মাত্রা উদ্ভাসিত। জাপানি শিল্পী হিশিদা ও টাইকানের কাছে তিনি ওয়াশ পদ্ধতি শিখেছিলেন; কখনও প্রতিতুলনায় টার্নারের ছবির কথাও মনে পড়ে। শহরের দানবাকৃতির বাড়িঘর যেন ক্রমে সত্য হয়ে ওঠে; আর প্রতিমা, আলোর রোশনাই, উৎসবের রেশ, স্মৃতি— সব ছোট থেকে ছোট হয়ে মিলিয়ে যায়। নগর আর আনন্দোৎসবের সংঘর্ষে জন্ম নেয় এক গভীর বিষাদ। সেই বিষাদ রঙে, রেখায়, এমনকী অনুপুঙ্খে ছড়িয়ে থাকে। ‘প্রতিমা বিসর্জন’-এ মঞ্চের স্পটলাইটের ব্যবহার যেন স্পষ্ট। আকাশের ঘনায়মান অন্ধকার আর নগরীর অন্ধকার এক নয়— অন্ধকারের এত মাত্রানির্মাণ সমসাময়িক অন্য কোনও চিত্রশিল্পীর কাজে দুর্লভ।
উত্তর কলকাতার ছাতুবাবু বাজার এবং হেদুয়ার মাঝে বিডন স্ট্রিটে আমি প্রথমবারের ভারত সফরে গিয়েছিলাম। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা কবি অরণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিল, ওই রাস্তা দিয়ে প্রায় সব উত্তর-মধ্য কলকাতার প্রতিমা ভাসানের শোভাযাত্রা গঙ্গা অভিমুখে যায়। ফলে নিজের দেখার অভিজ্ঞতার নিরিখে অরণ্য জানিয়েছিল, এ-ছবি ওর একান্ত বাস্তবের। হুতোমের কলকাতা, গগনের কলকাতা এবং অরণ্যর কলকাতা যেন এ-ছবিতে প্রায় দেড়শো বছরের চিত্রকল্প বুকে নিয়ে আছে। ছবি অবশ্য বাস্তবের আলোকচিত্রের থেকে বেশি ইশারা দেয়। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে পুরো ছবিতে একটা রহস্য আছে, আছে দূরগামিতার বিষাদ। আলো আর আঁধারের সঙ্গম বা টেনশনে, বাড়ির বারান্দা আজ ঘর-কার্নিশের কেজো-কেঠো অবয়বে— নগর আর আনন্দোৎসব সংঘর্ষে গতি পায়। বাস্তব আর অলৌকিক বিরুদ্ধতায় বিষাদ উৎপাদন করে। ছবিটিতে সেই বিষাদ যেন ছড়িয়ে থাকে। রঙে-রেখায় তো বটেই, এমনকী অনুপুঙ্খ বা ডিটেলেও।
গগনেন্দ্রনাথ ব্রিটেনের ভারতের উপর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তার কার্টুনের মাধ্যমে সেই প্রভাবগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তার ‘ভাষণরত রবীন্দ্রনাথ’ ছবিতেও পিছন থেকে আঁকা রবীন্দ্রনাথ, মাথায় টুপি, সামনে শ্রোতার আভাস; আলোর বিম বা স্তম্ভের ব্যবহারে অন্ধকারের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাথের রহস্য বহুগুণ বেড়ে যায়। আলো-আঁধারের সেতু ছবিকে বাস্তবের রূপনির্মাণ থেকে বেদনা-দীর্ঘশ্বাসের বিমূর্ত অনুভূতির দিকে ঠেলে দেয়। রূপলোক থেকে অরূপের ইঙ্গিত, ঘটনা থেকে অনন্ত-অনিঃশেষ, কাঠামোবদ্ধ থেকে মহাজগৎ— এই অভিযাত্রাই গগন ঠাকুরের সাধনা। রবীন্দ্রনাথ তার মৃত্যুর পর লিখেছিলেন:
গগনেন্দ্রনাথ,
রেখার রঙের তীর হতে তীরে
ফিরেছিল তব মন,
রূপের গভীরে হয়েছিল নিমগন।
গেল চলি তব জীবনের তরী
রেখার সীমার পার
অরূপ ছবির রহস্যমাঝে
অমল শুভ্রতার।
(তারিখ ১৯.০৮.১৯৩৮)
কবিতাটি যেন গগনেন্দ্রনাথের শিল্পের
সারকথা। শিল্পকলার ইতিহাসে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর আজও সেই আড়ালের শিল্পী— যিনি আলো-আঁধারের
ভাষায় সমাজের ভণ্ডামি, নগরের বিষাদ, উৎসবের ক্ষণিকতা আর অরূপের রহস্য একসঙ্গে এঁকেছেন। তার
কার্টুন আজও তীক্ষ্ণ, তার ছবি আজও
রহস্যময়। এই অপরূপ রূপকারকে বাঙালি কী কালের করাল গ্রাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভুলতে
পারবে?
ঋণস্বীকার:
১. Expressionism. Britannica Encyclopedia, 1999.
২. Thakurta, G. The Making of a New Indian Art: Artists’ Aesthetics and Nationalism in Bengal. Cambridge University Press, 1992.
৩. Honoré Daumier. Britannica Encyclopedia, 1999.
৪. Jananadanandini, D. Wikipedia: The Free Encyclopedia.
৫. Chandi, L. Gaganendranath Tagore: Cartoon o Sketch, 2004.
৬. Lithography. Britannica Encyclopedia, 1999.
৭. Partha, M. Art and Nationalism in Colonial India, 1850–1922. Cambridge University Press, 1995.
৮. Ratan, P. Gaganendranath Tagore. National Gallery of Modern Art.













