লোকায়েত বাংলা
গাসসি উৎসব

বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। আর গ্রামীণ বাংলাদেশের সর্বত্র নানা রকম উৎসব চলতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপলক্ষের প্রয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই লোকউৎসবের প্রচলন হয়েছে। এরকম একটি উৎসব হলো গোপালগঞ্জ জেলায় প্রচলিত আশ্বিন মাসের শেষ দিনের গাসসি উৎসব। গাসসি শব্দের আভিধানিক অর্থ পাওয়া যায় না। সংগত কারণে কিংবদন্তি ও কথাকারদের ব্যাখ্যা-বিবরণী নিয়ে অদ্যাবধি গোপালগঞ্জ জেলার গোপালগঞ্জ, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর, কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া ও এর আশপাশের এলাকাগুলোয় মহাধুমধামে গাসসি উৎসব উদযাপন হয়ে আসছে।
কিংবদন্তি আছে, হিন্দু ধর্মমতে— ‘দেবী দুর্গা আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির দিন পড়ন্ত বিকালে রন্ধনকর্ম শেষ করে স্বামী শিবকে খাওয়ানোর জন্য পতির নিকটস্থ হলেন। মহামায়া দুর্গা তার হাবভাব দেখে বুঝতে পারলেন, আজ নিশীথে ডাকিনী বিহারের জন্য শিব প্রস্তুত হচ্ছেন। দেবী দুর্গা তাকে ওই পথ থেকে ফেরানোর জন্য বিনয় বচনে একেক যোগতত্ত্বের ব্যাখ্যা জানতে থাকেন। রাত গভীর হচ্ছে, তবুও দুর্গার প্রশ্ন করা শেষ হচ্ছে না। সারা রাত দুজনের মধ্যে চলে যোগতত্ত্বের প্রশ্নোত্তর পর্ব। আঁধার কেটে গেল, পাখিরা ভোরের গীত গাইতে শুরু করল। দুর্গা ভাবলেন এখন দিন হয়েছে, শিব আর কুচনিপাড়ায় যেতে পারবেন না। তাই তিনি স্বামী শিবকে বললেন, এসো ভাত-ব্যঞ্জন রান্না করেছিলাম। এবার পেট ভরে খেয়ে নাও।’ সেই থেকে আজও মানুষ আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির দিনে পহেলা কার্তিক খায়।
এজন্য লোকসমাজে প্রবাদ প্রচলিত— গোপালগঞ্জ জেলার সর্বত্র এভাবে ‘আশ্বিেন রান্দে-বাড়ে কার্তিকে খায়/বুড়ি সেই বর দেয় যে বর চায়।’ এ সময়ে এখনো ছাত্রছাত্রীরা সারা রাত জেগে বই পড়ে। যার যে বিদ্যা জানা আছে তা সে এই রাতে তরজমা করতে থাকে। ধর্মপ্রাণ মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় দেহতত্ত্বমূলক গান পরিবেশন করে থাকেন। ধর্মীয় আবেশে মুসলমানদের শবেবরাতের আদলে গোপালগঞ্জ জেলার হিন্দু অধিবাসীরা এ উৎসব পালন করে থাকে। সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণে এ উৎসব ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে খ্রিস্টান-মুসলমানদের মধ্যেও পালিত হয়ে আসছে।
উদাহরণ— মুসলমানদের মধ্যে আলোচ্য গাসসি উৎসব পালনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বনগ্রামে হাজার চাঁদ ফকিরের মাজারে গেলে সহজে বুঝতে পারা যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভক্তরা ওই গাসসির রাতে যোগদান করে থাকেন। অনেক হিন্দুও সেই অনুষ্ঠানে যোগদান করে হাজার চাঁদ ফকিরের গুণগান করে। ফলে, হিন্দু-মুসলমান একত্রে ভাবের ঘরে একাকার হয়ে আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করে। গানের কয়েকটি চরণ— দেল কোরআন ঠিক না করে/আয়াত কোরআন কেউ পড় না/মানবদেহের ভেদ জেনে কর সাধনা/আলেফ লাম নাসিকা খানি/শেরে দুই কণ্ঠে জানি/জিমে হয় জিকিরের ধ্বনি…
এ ছাড়া এই গাসসি রাতের শেষভাগে দেখা যায় আলোর মিছিল। প্রত্যেক গৃহস্থ ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বেলে পথে, ঘরের কোণে, দেবালয়ে সাজিয়ে দেয়। গাসসির রাতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ উপভোগ করে কিশোর-বালকরা। তারা দল বেঁধে কলাগাছের ডগা নিয়ে প্রতিটি ঘরের বেড়ায় সম্মিলিতভাবে পিটায়ে পিটায়ে বলতে থাকে—
ইন্দুর বান্দর দূর যা
পাগলার মা’র নোট খুঁচে খা
ইন্দুর বান্দর দূর যা
ফটিকের মা’র নোট খুঁচে খা
ইন্দুর বান্দর দূর যা
কেনার মা’র নোট খুঁচে খা।
আবার এভাবে বলতে থাকে—
এই বাড়ির ইন্দুর-বান্দর ওই বাড়ি যায়
ওই বাড়ির শিব ঠাকুর এই বাড়ি আয়।
এখানে ছড়ায় উল্লিখিত ইন্দুর-বান্দর বলতে অশুভ উপকরণের কথা ও অসুখবিসুখ, রোগব্যাধি, বিপদ-আপদ দূর করার কথা বলা হয়েছে। বিপরীতভাবে অন্যবাড়ি বা প্রকৃতির কাছ থেকে শুভফলপ্রদ উপকরণকে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ গোপালগঞ্জ জেলার মুসলমানদের এলাকায়ও গাসসি উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এ জেলার মহিলারা আশ্বিন মাসের শেষ দিন সূর্য ডোবার আগে নিমপাতা, বেলপাতা, কাঁচা হলুদ, তেতুঁল ইত্যাদি জোগাড় করে রাখেন। ভোরে সেসব পাটায় পিষে গায়ে মেখে গোসল করার রেওয়াজ এখনো প্রচলিত। তাদের ধারণা, এটি হলো শীতের দিনে গায়ের মলিনতা দূর করার পূর্বপ্রস্তুতি।



