স্মরণে বেগম আখতার
বাইজি থেকে মল্লিকা-এ-গজল

বেগম আখতার (৭ অক্টোবর ১৯১৪ - ৩০ অক্টোবর ১৯৭৪)
সুরে সুরে জমে উঠছে ঘনকৃষ্ণ মেঘ—
যে ফিরায়ে দেবে, তার
(বেগম আখতারের গান/ রণজিৎ দাশ)
রণজিৎ দাশের এই কবিতার আরাধ্যের আকুতি যদি কেউ সৃজন করে থাকেন, তিনি আখতারিবাই (ফৈজাবাদি)। কেননা তাঁর গলায় যেকোনো গজল শুনলে মনে হয়, গায়ক নন— একজন নারী তাঁর সমগ্র জীবনটাকে আকাঙ্ক্ষার সুরে গেঁথে দিয়েছেন। যে— জীবনে বিচ্ছেদ এসেছে বারবার, যে— জীবনে বাবা হারানো, বোন হারানো, শরীর হারানো, স্বাধীনতা হারানো— সেই জীবনের প্রতিটি ক্ষত যদি স্বর হয়ে ওঠে, তবে তার নাম হয় পৃথিবীতে বেগম আখতার। যাঁকে গজলের জগৎ চেনে মল্লিকা— এ— গজল নামে।
১৯১৪ সালের ৭ অক্টোবর, উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে জন্ম। বাবা আসগর হুসেন লখনৌয়ের আইনজীবী, মা মুস্তারি তওয়াইফ। প্রেমে পড়ে আসগর বিয়ে করেছিলেন মুস্তারিকে— দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু সেই প্রেম বেশি দিন টেকেনি। বিয়ের অল্প দিনের মধ্যেই আসগর মুস্তারি ও যমজ মেয়েদের ঘর থেকে বের করে দেন। দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মা চলে আসেন ফৈজাবাদে।
ছোট্ট আখতারির জীবনের প্রথম বিচ্ছেদ— বাবার মুখ। সারা জীবন তিনি বাবাকে খুঁজেছেন, পাননি। এরপর শুরু মা ও বোনের সঙ্গে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের মধ্যেই আসে দ্বিতীয় আঘাত। বয়স তখন মাত্র চার। বিষ মিশ্রিত মিষ্টি খেয়ে হাসপাতালের পথেই মৃত্যু হয় যমজ বোন জোহরার। ছোট্ট আখতারি— তখন তাঁকে ডাকা হতো বিব্বি বলে— তাঁর একমাত্র সমবয়সী সঙ্গীকে খুঁজতে থাকেন। পান না। মাকে বারবার জিজ্ঞেস করেন বোনের কথা। মা বলেন, ‘বোন গিয়েছে আল্লাহর বাড়ি…’ বহু দিন পর্যন্ত আখতারি জানতেনই না, বোন সত্যিই কোথায় গেল। এই অস্পষ্টতা, এই না জানার যন্ত্রণা— এটাই বোধহয় তাঁর জীবনের প্রথম গজল, যা তিনি তখনো গাইতে শেখেননি।
সুরের দিকে প্রথম টান ঘটে কাকার ইচ্ছায়। মাত্র সাত বছর বয়সে আখতারির গানের শিক্ষা শুরু। উস্তাদ ইমদাদ খাঁ, সেই সরেঙ্গির কিংবদন্তি— তাঁর কাছে প্রথম পাঠ। তারপর আতা মোহাম্মদ খাঁ, কলকাতায় এসে মোহাম্মদ খাঁ, আবদুল ওয়াহিদ খাঁ— এই শিল্পীদের কাছে তালিম। শেষে উস্তাদ ঝান্ডে খাঁ সাহেবের শিষ্যত্ব। কলকাতা তখন তাঁর কাছে নতুন শহর, কিন্তু সে-শহরই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে ওঠে। কারণ এই কলকাতাতেই হয়েছিল তাঁর জীবনের প্রথম স্টেজ অনুষ্ঠান।
এক শিল্পী শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানে আসেননি। উপায়ান্তর না দেখে স্টেজে তুলে দেওয়া হয় আখতারিকে। তিনি পরে বলেছিলেন, ‘আমি এর আগে কখনও স্টেজে অনুষ্ঠান করিনি। এত মানুষ স্টেজের উপর থেকে দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল, বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে যাব। একটু বেশি সময় নিয়েছিলাম গান ধরতে। তখন আল্লাহকে বলেছিলাম, শক্তি দিতে। মুমতাজ বেগমের গাওয়া আমার সবচেয়ে প্রিয় ওই গজল দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করি। শুরুর পর অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম।’ স্টেজ থেকে নামতে না নামতেই গুণমুগ্ধের ভিড় তাঁকে ঘিরে ধরে। তাদের মধ্যে একজন বলেছিলেন, ‘আমি এখানে আসার সময় ভেবেছিলাম, কিছুক্ষণ থেকে চলে যাব। কিন্তু তুমি আমাকে গোটা অনুষ্ঠান বসে থাকতে বাধ্য করলে। আমি আজ তোমার অনুষ্ঠান শুনলাম। তুমি আগামীকাল আসবে আমার অনুষ্ঠানে।’ সেই মানুষটি সরোজিনী নাইডু। পরের দিন তিনি আখতারিকে একটি খাদির শাড়ি উপহার পাঠান। গান গেয়ে পাওয়া এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম উপহার।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে প্রথম প্রকাশ্য পরিবেশনা, আর তার মধ্য দিয়েই সঙ্গীতজগতে ঝড়। সেই সময়েই মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির জন্য তাঁর প্রথম ডিস্ক রেকর্ড। এরপর গজল, দাদরা, ঠুমরী— একের পর এক গ্রামোফোন রেকর্ড। কলকাতায় থাকাকালীন অর্থকষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী। সেই অর্থকষ্ট থেকেই মুক্তি পাওয়ার তাগিদে প্রথম রেকর্ডিং।
এইচএমভি’র হয়ে আখতারির প্রথম কিছু গজল ও ঠুমরী রেকর্ড হয়। তার মধ্যে একটি ছিল, ‘বো আসীরে দাম-এ-বলা হুঁ ম্যায়’। গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯২৫ সালে, বিভিন্ন জলসায় গান ও রেকর্ডিং চলার মধ্যে আখতারি মনস্থ করেন— তিনি শুধুই সঙ্গীত শিল্পী হবেন। কথাটা মাকে বলেন। মা খুবই চিন্তায় পড়েন, কারণ মেয়ে তখন বিবাহযোগ্যা। মুস্তারী আখতারিকে নিয়ে যান বরেলি শরিফে এক সুফি পীরের কাছে। পীরবাবা একটি বিশেষ গান বেছে দেন এবং পরবর্তী অনুষ্ঠান ওই গজল দিয়ে শুরু করতে আদেশ দেন। সেই গজল— ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো, দিওয়ানা বানা দে।’ এইচএমভি এই গানটি রেকর্ড করে। ফলাফল অবিশ্বাস্য— এইচএমভির সমস্ত রেকর্ড বিক্রি শেষ হয়ে যায়, অথচ চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তেই থাকে। এই গানটিই তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেয়। বেহজাদ লক্ষ্ণবীর লেখা এই গজল আজও বেগম আখতারের অমরত্বের স্মারক।
বেগম আখতার প্রায় গজল গায়কীর সমার্থক। তিনি নিজের এক অনন্য শৈলী তৈরি করেছিলেন, যার ধারেকাছে খুব কম শিল্পী এসেছেন। তাঁর গায়কীতে শাস্ত্রীয় কেতার সংমিশ্রণ ছিল, যেখানে ঠুমরী ও দাদরার পূরব ও পাঞ্জাবী শৈলীর মাধুর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি গজল গাইতেন রাগের উপর ভিত্তি করে, কিন্তু কখনো রাগের অনুশাসনে আটকে থাকতেন না। উর্দু কবিতার সৌন্দর্যকে তিনি সুরে এমনভাবে বাঁধতেন যে শব্দগুলো যেন কথা বলত। তাঁর গায়কীতে ছিল একদিকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে গজলের আবেগের স্বাধীনতা। সময়ের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ পরিণত হয়েছিল, যুক্ত হয়েছিল গাম্ভীর্য ও গভীরতা। তাঁর প্রায় চারশো গান রয়েছে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর নিয়মিত শিল্পী ছিলেন তিনি। সাধারণত নিজেই তাঁর গজল রচনা করতেন। তাঁকে না বলে আর কাকেই বা বলা হবে ‘মল্লিকা-এ-গজল’?
তবে বাংলাভাষী শ্রোতার কাছে বেগম আখতারের নাম মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ‘জোছনা করেছে আড়ি’-ই যথেষ্ট। গানটির কথা ও সুর রবি গুহ মজুমদারের সারেগামার নিজস্ব বাংলা প্রকাশনায় এ তথ্য রয়েছে। শিল্পকেন্দ্রের রেকর্ড তালিকা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের একটি রেকর্ডের এক পিঠে ছিল এই গান, অন্য পিঠে ‘এ মৌসুমে পরদেশে’। এখানে জোছনা যেন অভিমানী এক মানুষ। চারপাশে তার উপস্থিতি অথচ সে আসে না কথকের বাড়িতে। পরিচিত আলো, বাড়ি ও গলির চিত্রকল্পে ধরা পড়ে অপেক্ষা আর বঞ্চনা। বেগম আখতারের বাংলা গানের পেছনে সংগীতজ্ঞ জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাঁর স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, কলকাতা বেতারের জন্য তিনি বেগম আখতারকে দিয়ে ঠুমরি ও দাদরা অঙ্গে বাংলা গান প্রস্তুত করিয়েছিলেন। বাংলা গানে তিনি যেন অন্য এক আখতার— যেখানে উর্দু গজলের গাম্ভীর্যের সঙ্গে মিশে যায় বাংলা মাটির স্নিগ্ধতা। আর তাঁর গজলের ভুবনে কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিবিড়। ‘কুছ তো দুনিয়া কি ইনায়াত নে দিল তোড় দিয়া’র রচয়িতা সুদর্শন ফাকির। পৃথিবীর আচরণ ও জীবনের তিক্ত পরিস্থিতি কীভাবে হৃদয় ভাঙে, তার কথা রয়েছে এই গজলে। প্রেমের কষ্টের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জীবনের অন্য আঘাতও। জলন্ধরের অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বেগম আখতারের সঙ্গে ফাকিরের পরিচয় হয়। নিজের কবিতা দেখালে শিল্পীর পছন্দ হয় এই গজল এবং ‘ইশক মে গয়রত-এ-জজবাত নে রোনে না দিয়া’। বেগম আখতারের কণ্ঠ তরুণ কবির লেখাকে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যায়। শিল্পকেন্দ্রের রেকর্ড তালিকায় ১৯৬৯ সালের একটি দীর্ঘ রেকর্ডে ‘কুছ তো দুনিয়া’র উল্লেখ রয়েছে।‘মেরে হামনফস মেরে হামনওয়া’ লিখেছেন শাকিল বদায়ুনি। এখানে আপনজনের কাছে আবেদন— বন্ধু হয়ে প্রতারণা কোরো না! প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, আর সেই বিশ্বাস হারানোর আশঙ্কা। বেগম আখতারের এই গানের প্রকাশিত সংস্করণে সুরকার হিসেবে খৈয়ামের নাম পাওয়া যায়। শিল্পকেন্দ্রের ঘটনাপঞ্জি ও রেকর্ড তালিকা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে এইচএমভির একটি দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের রেকর্ডে গানটি প্রকাশিত হয়। একই রেকর্ডে ছিল ‘দূর হ্যায় মঞ্জিল, রাহেঁ মুশকিল’সহ আরও কয়েকটি গজল। বেগম আখতারের পরিণত বয়সের রেকর্ডজীবন ও খৈয়ামের সঙ্গে কাজের পরিচয় মেলে এই গানেও।
মোমিন খাঁ মোমিনের লেখা ‘ওহ জো হাম মে তুম মে করার থা’য় ফিরে আসে পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি। প্রতিশ্রুতি, আদর, অভিযোগ, কথায় কথায় অভিমান— একজনের সব মনে আছে। অন্যজনের মনে আছে কি না, সেই সংশয় কবিতায় বারবার ফিরে আসে। নির্বাচিত গজলের তালিকায় এই রচনা রয়েছে। শিল্পকেন্দ্রের রেকর্ড তালিকায় ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত একটি রেকর্ডেও গানটির উল্লেখ আছে। একই পিঠে ছিল ‘উজর আনে মে ভি হ্যায়’ ও ‘উলটি হো গয়ি সব তদবিরেঁ’। বেগম আখতারের মৃত্যুর পর প্রকাশিত এই রেকর্ডে পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে পুরোনো উর্দু কবিতার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনা।
আর গালিব? ‘ইয়ে না থি হামারি কিসমত’ মির্জা গালিবের লেখা। প্রিয়জনের সঙ্গে মিলিত হতে না পারার বেদনা দিয়ে শুরু। আরও বেঁচে থাকলেও সেই অপেক্ষাই চলত— এমন উপলব্ধির পাশে রয়েছে প্রতিশ্রুতি, সংশয় ও আক্ষেপ। গালিবের কবিতা তাঁর সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল। শিল্পকেন্দ্রের আর্কাইভ অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে গালিবের মৃত্যুবার্ষিকীর শতবর্ষের আয়োজনে তিনি অংশ নেন এবং গালিবের গজলের একটি দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের রেকর্ড প্রকাশ করেন। তাঁর কণ্ঠে গালিবের ‘ইয়ে না থি হামারি কিসমত’ বেশ পরিচিত একটি গান।
লখনউয়ের রাস্তায় একদিন দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন আখতারী বেগম। ১৯৩৪ সাল। তরুণ আইনজীবী ইশতিয়াক আহম্মদ আব্বাসি কোনোরকমে প্রাণে বাঁচেন, গাড়িটা তাঁকে আর একটু হলেই চাপা দিচ্ছিল। সেই ঘটনা থেকে শুরু দীর্ঘ আলাপ, আলাপ থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে। আব্বাসি ছিলেন লখনউয়ের প্রসিদ্ধ ব্যারিস্টার, কাকলির নবাব। বিয়ের পর আখতারী অযোধ্যার ‘উচ্চবিত্ত’ সমাজে অন্যভাবে সমাদৃত হন— বাইজি থেকে বেগম। কিন্তু এই উন্নীতির দাম দিতে হয় সবচেয়ে চড়া মূল্যে। শর্ত রাখা হয়— বেগম সাধারণ আসরে আর গান গাইতে পারবেন না। তিনি মেনে নেন। হয়তো নিজেও চেয়েছিলেন ঘরোয়া জীবন, গ্ল্যামার থেকে বিরতি। কিন্তু ক্রমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। প্রায় পাঁচ বছর গান বন্ধ। শরীর ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, কোনো ওষুধে এই রোগ সারবে না; তাঁকে গানে ফেরাতেই হবে। সঙ্গীতই একমাত্র ঔষধ।
১৯৪৯ সালে লখনউ রেডিওতে তিনটি গজল আর একটি দাদরা রেকর্ড করেন তিনি। অল ইন্ডিয়া রেডিওর নথিতে দেখা যায়, সম্প্রচারের সময় তাঁকে বেগম আখতার বলে সম্বোধন করা হয়। রেকর্ডিং করে এত আনন্দ পান যে বাড়ি ফিরে অঝোরে কেঁদে ফেলেন। সেদিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি মঞ্চে গান গেয়ে গেছেন। এর মধ্যেই ঘটে যায় মাতৃবিয়োগ। শোনা যায়, সমাধিস্থ করার সময় আখতারি নিজেই সেই সমাধিতে নেমে পড়েন, কিছুতেই উঠতে চান না। শেষে গানের কথা বলে তাঁকে ফেরানো হয়। জীবনভর এই ছোট-বড় অসংখ্য দুঃখ থেকেই উৎসারিত তাঁর গান।
বেগম আখতারের প্রভাব তাঁর জীবনকালকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। লতা মুঙ্গেশকর, মেহেদী হাসান, জগজিৎ সিং— এই কিংবদন্তিরা তাঁর গায়কীকে অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বীকার করেছেন। লতা মঙ্গেশকর একবার বলেছিলেন, রেডিওতে শ্রোতা হিসেবে বেগম আখতারের গজলের অনুরোধ করতে পারা তাঁর জীবনের একটি বড় পাওয়া। বেগম আখতারই গজলকে ‘লঘু সঙ্গীত’ থেকে মুক্ত করে কবিতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি গজলের সঙ্গে রাগের সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তী শিল্পীদের পথ দেখিয়েছিল। শান্তি হিরানন্দের মতো শিষ্যরা তাঁর উত্তরাধিকার বহন করেছেন। আজকের গজল গায়কীর যে রূপ, তা অনেকটাই বেগম আখতারের হাত ধরে তৈরি।
১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর, আহমেদাবাদ। বেগম সাহেবার ষাট বছরের জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান। শরীর ভালো নেই, দু’বার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, দুর্বলতা, সঙ্গে জ্বর। তবু উৎসাহে ভাটা নেই। কাইফি আজমী জন্মদিন উপলক্ষে একটি গজল লিখেছেন, সেটাও গাইতে হবে। ভিড়ে ঠাসা অডিটোরিয়াম। পর্দা ওঠামাত্র হাততালি। একের পর এক অনুরোধ, জনপ্রিয় গান, উঁচু স্কেল। শেষ অনুরোধ— আরও একটি গান। হারমোনিয়ামে আবার সুর। গানের মাঝখানে মঞ্চেই তৃতীয়বার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলেন। অজ্ঞান। হাসপাতাল, তিন দিন পর, ৩০ অক্টোবর ১৯৭৪, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন মর্ত্যে। মৃত্যুর পর পেলেন ভারত সরকারের পদ্মভূষণ।
আজও যখন তাঁর গান বাজে, তখন মনে হয় তিনি চলে যাননি। চুপি চুপি শুধু স্টেজ থেকে নেমে গেছেন, নিশুতি রাতে গাইতে গাইতে। তাঁর গলায় যে— গজলটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি দিয়েই শেষ করা যাক— ‘দিওয়ানা বানানা হ্যায় তো, দিওয়ানা বানা দে— ওরনা কাহিন তকদীর তামাশা না বানা দে’।
বেগম আখতারকে দিওয়ানা বানাতে হয়নি কাউকে। তিনি নিজেই ছিলেন সুরের দিওয়ানা। আর সেই দিওয়ানগির মধ্য দিয়েই তিনি বাইজি থেকে বেগম, বেগম থেকে মল্লিকা-এ-গজল হয়ে উঠেছিলেন, হয়ে রয়েছেন গজলের আকাশে।










