বাংলা একাডেমিতে সেমিনার
সাহিত্যের চার দিকপালকে স্মরণ

ছবি: আগামীর সময়
কবি জীবনানন্দ দাশ, কবি আল মাহমুদ, লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ এবং কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম স্মরণে সেমিনার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। আজ শনিবার একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় দিনব্যাপী এই সেমিনার।
প্রথম পর্বে সকাল সাড়ে ১০টায় কবি আল মাহমুদ স্মরণসভায় ‘কবিতাহীন সময়ে কবির কাল’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও সম্পাদক রেজাউল করিম রনি। তিনি বলেছেন, ‘আল মাহমুদ কবিতায় সময়ের মুখ অঙ্কন করেছেন। কবিতাহীন দুঃসময়কে কবিতাপ্রতিম মানবিক সময়ে উত্তরণের কথা উচ্চারণ করেছেন, কারণ কবিতাহীন সময়ে কবির কাজ এমনই হওয়ার কথা। আল মাহমুদের কবিতায় লোকজীবনের যে অনুপম ছবি বাঙ্ময় হয়েছে দর্শনগত দিক দিয়ে তা সময় থেকে সময়াতীত ব্যঞ্জনায় ভাস্বর।’
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কবি সাজ্জাদ শরিফ। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। এর আগে সেমিনার সিরিজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, ‘জীবনানন্দ, আল মাহমুদ, মনিরউদ্দীন ইউসুফ ও রশীদ করীম বাংলা সাহিত্যকে নানাভাবে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের কৃতি নিয়ে বিশদ গবেষণা হয়েছে। বাংলা একাডেমির সেমিনারে তাদের সৃজনকর্মের বিভিন্ন দিকে নতুন দৃষ্টিতে ফিরে তাকানোর অবকাশ তৈরি হয়েছে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা বলেছেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের পথিকৃৎ গুণীজনদের স্মরণে বছরব্যাপী ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলা একাডেমিসহ মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ রাজধানী এবং এর বাইরে গুণীজনদের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গুণীজন স্মরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করছে। এটা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জগতে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা নিঃসন্দেহে। কারণ সৃজন-মননের জগতের যেসব উজ্জ্বল নক্ষত্র তাদের জীবন ও কৃতির মধ্য দিয়ে আমাদের অগ্রসর রুচি নির্মাণ ও বুদ্ধির মুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছেন, তাদের দিকে ফিরে তাকানো এবং তাদের সৃজনকর্মের বিচার-বিশ্লেষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।’
একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা বলেছেন, ‘বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গুণীজনদের স্মরণ করে আসছে। এবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আমরা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জীবন ও কৃতি সম্পর্কে বিষয়ভিত্তিক সেমিনারের আয়োজন করেছি, যা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।’
দুপুর ১২টায় লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ স্মরণসভায় ‘বাংলার ফেরদৌসী মনিরউদ্দীন ইউসুফ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ড. হালিম দাদ খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন লেখক ও অনুবাদক জাভেদ হুসেন। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন লেখক ও আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন।
প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘আমাদের সাহিত্য ও জনপরিসরে মনিরউদ্দীন ইউসুফ পারস্য মহাকাব্য শাহনামার পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদকারীর কৃতিতে সুপরিচিত। যদিও তিনি সাহিত্যের আরও নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন। তবে শাহনামা অনুবাদসহ তার সমস্ত সাহিত্যকৃতির নেপথ্যেই ক্রিয়াশীল ছিল জাতিগত স্বতন্ত্র ঐতিহ্যচেতনা ও মৃত্তিকালগ্ন অঙ্গীকার।’
বেলা আড়াইটায় কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণসভায় ‘জীবনানন্দ ও অন্ধকার’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও গবেষক কুমার চক্রবর্তী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।
প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘জীবনানন্দ দাশ কবিতা ও সামগ্রিক রচনাকর্মে আলো-আঁধারির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন আজীবন। অন্ধকার তার লেখায় শুধু রূপক হিসেবে আসেনি বরং অস্তিত্বের গাঢ় সংবেদ হিসেবে আলোর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে উদ্ভাসিত হয়েছে।’
বিকাল ৪টায় কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম স্মরণসভার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপ্তি হয়। শেষ পর্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘রশীদ করীমের উপন্যাস : মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতা নাগরিক চেতনা ও মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের শিল্পরূপ’ শীর্ষক সেমিনার। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও গবেষক অধ্যাপক মাসুদুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক হোসনে আরা। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক।
প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘রশীদ করীম বাংলা কথাসাহিত্যে সংযোজন করেছেন নতুন মাত্রা। তার স্বল্পসংখ্যক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিগদ্যে তিনি সতত স্বাতন্ত্র্য-সমুজ্জ্বল। তার উপন্যাসের দীর্ঘ ও হ্রস্ব ক্যানভাসে বাঙালি মুসলমানের শতাব্দীব্যাপী অভিযাত্রা উদ্ভাসিত হয়েছে। আমাদের নাগরিক জীবনের উন্মেষপর্ব তার কথাসাহিত্যে বিশ্বস্ত স্বর খুঁজে পেয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না।’
সেমিনার সিরিজের সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব, উপপরিচালক ইমরুল ইউসুফ এবং সহপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মাহবুবা রহমান।







