স্মরণ
করুণ সুরের গীতিকবি
- অতুলপ্রসাদ সেন

অতুলপ্রসাদ সেন
‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা’— এই অমর পঙ্ক্তির স্রষ্টা অতুলপ্রসাদ সেন বাংলা কাব্যগীতির এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন মাত্র ২০৬টি গান রচনা করেই। বলা যায়, তিনি বাংলা সংগীতভাণ্ডারে এক অক্ষয় আসন লাভ করেছেন। তার গান ‘অতুলপ্রসাদের গান’ নামে পরিচিত।
তার প্রধান কীর্তি বাংলা গানে হিন্দুস্তানি রাগসংগীতের বিভিন্ন রূপ— ঠুমরি, দাদরা, খেয়াল, টপ্পা, গজল— সাফল্যের সঙ্গে সংযোজন। তিনিই প্রথম বাংলা গানে ঠুংরির চল আনেন; ‘কি আর চাহিব বলো’ (ভৈরবী/টপ্পা, খেয়াল), ‘ওগো নিঠুর দরদি’ (মিশ্র আশাবরী-দাদরা), ‘যাব না যাব না ঘরে’ তার প্রসিদ্ধ ঠুমরি। রাগপ্রধান গানে ‘বধূ ধর ধর মালা’ (কালিংড়া), ‘তবু তোমায় ডাকি বারে বারে’ (সিন্ধু কাফি) আজও সংগীতবোদ্ধাদের প্রিয়। খাম্বাজ, ভৈরবী, পিলু, নটমল্লার, নায়কি কানাড়া প্রভৃতি রাগের মিশ্রণে তিনি সুরারোপ করেছেন।
তার গানে করুণ রস প্রধান। ব্যক্তিজীবনের বেদনা— পিতৃবিয়োগ, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে, মামাতো বোন হেমকুসুমের সঙ্গে সমাজবিরুদ্ধ বিয়ে, দাম্পত্য বিচ্ছেদ, পুত্রশোক— তার সৃষ্টির গভীরে প্রভাব ফেলেছে। তাই তার গান হয়ে উঠেছে বেদনা-বিধুর নয়ন-জলের। ‘বধূয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে’ (বেহাগ), ‘বিধি, আর তো তোমারে নাহি ডরি’, ‘এত হাসি আছে জগতে’— এসব গানে বেদনার সুর চিরন্তন। দিলীপকুমার রায় বলেছেন, ‘গভীর দুঃখ পাওয়া সার্থক, যদি সে দুঃখে একটি গানও ফোটে আঁধারে তারার মতো— অতুলপ্রসাদের গানের আকাশ তেমনই নক্ষত্রখচিত।’
কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালির প্রভাবও তার গানে স্পষ্ট। ‘মন রে আমার শুধু তুই বেয়ে যা দাঁড়’, ‘মোদের গরব মোদের আশা’, ‘উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী’— এসব গানে বাংলার মাটির সুর ফুটে উঠেছে। দেশাত্মবোধক গানে তিনি সমান উচ্চকণ্ঠ: ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’, ‘খাঁচার গান গাইব না আর’, ‘দেখ মা এবার দুয়ার খুলে’। ‘মোদের গরব...’ গানটি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অফুরান প্রেরণা জুগিয়েছে, আজও তার আবেদন অম্লান।
বিদেশি সুরের সার্থক বাংলা রূপান্তরেও তিনি দক্ষ ছিলেন। বিলেত যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের গণ্ডোলা-চালকদের সুরে লিখলেন ‘উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী’; ‘Home, sweet home’ সুরে ‘প্রবাসী, চল্ রে দেশে চল্’। তাতে হারিয়ে যায়নি মৌলিকতা, বরং বাংলা গান পেয়েছে নতুন মাত্রা।
তার কবিত্ব অসামান্য। সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনদর্শন— বৈরাগ্য, ভক্তি, প্রেম, স্বদেশানুরাগ— প্রকাশিত হয়েছে। ‘আমারে রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাঁই’— এই পঙ্ক্তিতে তার উদার মানবতাবোধ ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথ তাকে ‘পরমাত্মীয়’ বলতেন; ‘পরিশেষ’ কাব্যটি তাকে উৎসর্গ করেছিলেন। মামাতো বোন সাহানা দেবীর সম্পাদনায় তার ৭১টি গানের স্বরলিপি ‘কাকলি’ (১৯৩০) প্রকাশিত হয়; ‘গীতিগুঞ্জ’ সংকলনে তার গান পাঁচটি ভাগে বিন্যস্ত— দেবতা, প্রকৃতি, স্বদেশ, মানব ও বিবিধ।
অতুলপ্রসাদ শুধু গীতিকার নন, সার্থক সুরকারও। করুণ রসের অমৃত স্রষ্টা এই গীতিকবি বাঙালির চিরন্তন সম্পদ। ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট লক্ষ্ণৌতে এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান হয়। তার চিতাভস্ম ঢাকার কাছেই গাজীপুরের কাওরাইদে সমাধিস্থ। আজও ‘অতুলপ্রসাদের গান’ স্বতন্ত্র মর্যাদায় বাঙালির হৃদয়ে অম্লান।






