ঢাকা বারের নির্বাচন
গত আট নির্বাচনের মধ্যে কম ভোটের রেকর্ড!
- ২০২৬-২৭ সালে ভোট পড়েছে মাত্র ৩৪ শতাংশ
- ফেয়ার ইলেকশন হয়েছে : প্রধান নির্বাচন কমিশনার
- নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে : বিএনপিপন্থি আইনজীবী
- জালভোটের অভিযোগ জামায়াতপন্থি আইনজীবীর

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ কার্যকরী কমিটির নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৭ হাজার ৬৯ জন আইনজীবী। এই সংখ্যা মোট ভোটের মাত্র ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৩ হাজার ৭১৬ আইনজীবী দেননি ভোট। এবারের নির্বাচনসহ শেষ আটটি নির্বাচনে এত কম ভোট পড়ার রেকর্ড নেই। শতাংশ হিসেবে ২০১৮-১৯ সালে ভোট দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ। ভোটার সংখ্যা হিসেবে ২০২২-২৩ সালে ১১ হাজার ২৮৫ জন আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। আর ২০২৪-২৫ সালে ভোট পড়েছিল ৪৬ শতাংশ।
ভোটগ্রহণ শেষে জালভোটের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলছেন, ভালো হয়েছে নির্বাচন।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. বোরহান উদ্দিনের ভাষ্য, গত দুই বছর নির্বাচন হয়নি, হয়েছে নির্বাচন ছিনতাই। এই নির্বাচনের প্রতি আইনজীবীদের আস্থাহীনতা হয়ে গেছিল। তবে আমরা ফেয়ার ইলেকশন করে তাদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছি। সুষ্ঠু ও সুন্দর ভোট উপহার দিতে পেরেছি।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপিপন্থি আইনজীবী সৈয়দ নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বিগত নির্বাচনগুলো দেওয়া হয়েছে জালভোট। ভোট বেশি দেখানো হয়েছে কারচুপি করে। এবার একটি দলের সমর্থকরা ভোট দেওয়া থেকে বিরতি ছিল। স্বাভাবিক অর্থের ভোট কিছুটা কম পড়েছে। তবে বাস্তবে সঠিক, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে, যে যার ভোট নিজে দিতে পেরেছে। এতে আমরা খুবই সন্তুষ্ট।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবী আবদুর রাজ্জাকের অভিযোগ, এই ভোট শেখ হাসিনার স্টাইলে হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের কারণে আইনজীবীদের কাছে এই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। নির্বাচনে জালভোট দেওয়া হয়েছে।
বিগত সাত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৪-২৫ কার্যকরী পরিষদের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ২১ হাজার ২০৮ জন৷ নির্বাচনে ভোট দেন ৯ হাজার ৬৯০ জন, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। ওই নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের সাদা প্যানেল ২১টি পদে জয় পায়।
২০২৩-২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দেন ৯ হাজার ২৪৩ জন৷ ওই বছর ভোটার ছিল ১৯ হাজার ৬১৮। অর্থাৎ ৪৭ শতাংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। তবে ভোটে কারচুপির অভিযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল দল৷ ভোট গণনা শেষে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদসহ সব কয়টি পদে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা।
২০২২-২৩ সালে মোট ১৯ হাজার ৮৪৭ জন ভোটারের মধ্যে ১১ হাজার ২৮৫ জন আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা মোট ভোটের প্রায় ৫৭ শতাংশ পড়েছে। গণনা শেষে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৭টি পদে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল)। বিএনপি সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য নীল প্যানেল গ্রন্থাগার সম্পাদকসহ ছয়টি পদে জয়ী হয়।
২০২১-২২ সালে মোট ১৭ হাজার ৭৫৬ জন ভোটারের মধ্যে ৮ হাজার ৭০৬ জন ভোট প্রদান করেন, যা মোট ভোটের ৪৯ শতাংশ পড়েছে। ফলাফলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেল থেকে সভাপতিসহ ১৫ জন বিজয়ী হয়। আর বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক পদসহ ৮ জন বিজয়ী হয়।
২০২০-২১ কার্যকরী পরিষদের নির্বাচনে ১৮ হাজার ১৫০ জন ভোটারের মধ্য ৯ হাজার ২৯৯ জন আইনজীবী ভোট দেন, যা মোট ভোটারের ৫১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ফলাফলে সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১০টি পদে জয়লাভ করে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল। অন্যদিকে ১৩টি পদের জয় পায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা দলের প্রার্থীরা।
২০১৯-২০ কার্যকরী পরিষদের নির্বাচনে ভোটার ছিল ১৭ হাজার ৮৯৭ জন। তার মধ্যে ৯ হাজার ৩৬৪ জন ভোট দেন। এতে মোট ভোটারের ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ফলাফলে ২৭টি পদের মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১৮টি পদেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত সাদা প্যানেলের আইনজীবীরা। অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল প্যানেলের আইনজীবীরা ৯টি পদে বিজয়ী হন।
২০১৮-১৯ সালে মোট ১৬ হাজার ১২৯ জন ভোটারের মধ্যে ১০ হাজার ১০ জন আইনজীবী ভোট দেন, যা মোট ভোটের ৬২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ফলাফলে ২৭টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১২টি পদে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেল। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত নীল প্যানেল ১৫টি পদে জয়ী হয়।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২০২৬-২৭ কার্যকরী কমিটির নির্বাচনে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদ সমর্থিত আইনজীবীরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল) এবং জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ (সবুজ প্যানেলে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে নীল প্যানেল থেকে সভাপতি পদে মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আবুল কালাম খান রয়েছেন। সবুজ প্যানেল থেকে সভাপতি পদে এস এম কামাল উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মো. আবু বাক্কার সিদ্দিক লড়ছেন। উভয় প্যানেলে ২৩ জন করে মোট ৪৬ জন ছাড়াও স্বতন্ত্র আটজন প্রার্থী বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ মেয়াদে সর্বশেষ ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২১টি পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচিতরা আদালতে আসা বন্ধ করে দেন। এতে সমিতির সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই পরিস্থিতিতে ওই বছরের ১৩ আগস্ট অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। এরপর থেকেই তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এই কমিটি নির্বাচন পরিচালনায় কমিশন গঠন করেন। পরবর্তীতে গত ২৯ মার্চ প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. বোরহান উদ্দিন তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী দুটি প্যানেলে ২৩ জন করে মোট ৪৬ জন মনোনয়ন পত্র জমা দেন। পাশাপাশি আটজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৬ আইনজীবী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ দেখালেও অনুমতি না মেলায় অংশ নিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের বাইরে রাখতেই তাদের মনোনয়ন পত্র দেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিল নির্বাচন কমিশন।



