সর্বোচ্চ আদালতে চেয়ার খোঁজার লড়াইয়ে দিন শুরু আইনজীবীদের
- ১৬৭৪৩ জন সদস্যের মধ্যে কিউবিক্যাল আছে মাত্র ১৭০০ জনের
- বাজেট থাকলেও বিল্ডিং বানাতে জায়গার সংকট

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ন্যায়বিচারের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেন আইনজীবীরা। আদালত কক্ষের ভেতরে তাদের যুক্তি-তর্ক আর আইনি লড়াই রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে সচল রাখে। অথচ সেই আইনজীবীদেরই অনেকের দিন শুরু হয় একটি চেয়ার খোঁজার সংগ্রাম দিয়ে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনকে বলা হয় দেশের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশাজীবী সংগঠন। হাজার হাজার আইনজীবীর এই সংগঠন শুধু একটি পেশাগত প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি দেশের বিচারাঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু পরিহাস হলো, এই সংগঠনের সদস্যদের বড় একটি অংশের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা পর্যন্ত নেই।
প্রতিদিন সকালে আদালত প্রাঙ্গণে এসে অনেক আইনজীবী করিডরে দাঁড়িয়ে নথিপত্র গুছান, কেউ আবার এক টুকরো ফাঁকা জায়গার অপেক্ষায় সময় কাটান। সদ্য পেশায় আসা তরুণ আইনজীবীদের এই সংকট ভয়াবহ। ক্লায়েন্টের মামলা প্রস্তুত, আইনি গবেষণা কিংবা প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অনেক সময় করতে হয় অনুপযুক্ত পরিবেশে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইটি এক্সিকিউটিভ মো. ইউনূস মিয়া জানালেন, বর্তমানে সুপ্রিম েকার্ট বারে নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা ১৬৭৪৩। এর মধ্যে মাত্র ১৭০০ আইনজীবীর নামে কিউবিক্যাল (বসার রুম) বরাদ্দ আছে। এর বাইরে আইনজীবীদের জন্য তিনটি হলরুম আছে, যার প্রতিটিতে বসতে পারেন ৪০০-৫০০ জন করে আইনজীবী। পাশাপাশি নারী আইনজীবীদের জন্য আছে তিনটি কমনরুম, যার প্রতিটিতে বসতে পারেন ২০০-৩০০ জন করে আইনজীবী। সব মিলিয়ে বসার জায়গা পান ৩০০০-৩৫০০ জন আইনজীবী।
হলরুম ও কমনরুম যারা ব্যবহার করেন, তাদের মামলার ফাইল সংরক্ষণ করার সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বসার চেয়ারের পাসে স্তূপাকারে ফাইল সংরক্ষণ করে থাকেন। এতে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মামলার ফাইল নষ্ট বা হারিয়ে যায়। পাশাপাশি আশঙ্কা থাকে মামলার গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল জানালেন, সুপ্রিম কোর্ট বারে কিউবিক্যাল বরাদ্দে নীতিমালা থাকলেও তা মানা হয় না খুব একটা। মূলত সুপ্রিম েকার্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কমিটিতে যারা থাকেন তারাই জমা পড়া আবেদন বাছাই করে আইনজীবীদের রুম ও আসন বরাদ্দ দেন। এক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকেন রাজনৈতিক পরিচয় ও কাছের মানুষরা। সিনিয়রিটি বিশেষ কোনো যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয় না।
সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বললেন, বারের কিউবিক্যাল বরাদ্দ নীতিমালাটি খুবই সুন্দর। কিন্তু ১৯৯০-এর দশক থেকে আইনজীবীরা দ্বিদলীয় রাজনীতির ভাঁজে বিভক্ত হয়ে পড়লে নীতিমালা আর মানা হয়নি।
সূত্র জানিয়েছে, বড় ভবন নির্মাণের জন্য যথেষ্ট অর্থ আছে সুপ্রিম েকার্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের হাতে। ভবন নির্মাণের জন্য নেওয়াও হয়েছে কয়েকবার উদ্যোগ। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সে উদ্যোগ গেছে ভেস্তে।
যে মানুষগুলো দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লড়াই করেন, তাদের নিজেদের জন্য একটি সম্মানজনক কর্মপরিবেশের অভাব যেন এক নীরব বেদনার গল্প। বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় সেই প্রশ্ন— দেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ এই আইনজীবীদের জন্য কি সত্যিই পর্যাপ্ত জায়গা নেই?
সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় বার অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব কোনো জমি নেই। ফলে সুপ্রিম কোর্টের জমি বরাদ্দ চাচ্ছে বার অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু রাজি হচ্ছেন না প্রধান বিচারপতি। বারের নেতারা সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে। কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি। সমস্যা সমাধানে বারের বর্তমান কমিটি সম্প্রতি আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। পাশাপাশি সহায়তা চাইতে পারেন প্রধানমন্ত্রীরও।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে জায়গা চেয়েছি। তিনি রাজি হননি। কিন্তু আমাদের একটি ভবন লাগবে। আমরা আইনমন্ত্রীর কাছে একটি ভবন নির্মাণের জন্য কথা বলেছি। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।’
এই আইনজীবী নেতা আরও জানিয়েছেন, ভবন নির্মাণে তাদের কোনো অর্থসংকট নেই। কিন্তু সেজন্য শুধু জায়গা প্রয়োজন।





