আলোচিত মামলা দ্রুত শেষ হয় নিম্ন আদালতে, এরপর...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে গুলি করে হত্যা করা হয় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খানকে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে সারা দেশ। হত্যাকাণ্ডের দেড় বছর পর ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি এ মামলায় রায় দেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল।
রায়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলীর ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। এছাড়া সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে তিন পুলিশ সদস্য এবং পুলিশের তিন সোর্সকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে এরপর সাড়ে চার বছর কেটে গেলেও কার্যকর হয়নি এ মামলার রায়। বর্তমানে উচ্চ আদালতে ঝুঁলে আছে মামলাটি।
২০১৯ সালের ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজ রোডের ক্যালিক্স একাডেমির সামনে রিফাত শরীফকে তার স্ত্রী মিন্নির সামনে কুপিয়ে আহত করে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর সহযোগীরা। গুরুতর অবস্থায় রিফাতকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত। এ ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। এরপর সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ডকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও পাঁচ/ছয়জনের বিরুদ্ধে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ।
ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এক বছর পর ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এ মামলার রায় দেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান। মিন্নিসহ ৬ জনের ফাঁসি দেওয়া হয় ওই রায়ে। পরে নিয়ম অনুসারে একই বছরের ৪ অক্টোবর ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স পৌঁছে হাইকোর্টে। এরপর ৬ অক্টোবর হাইকোর্টে আপিল করেন মিন্নিসহ অন্য আসামিরা। এরপর ৬ বছর কেটে গেলেও কার্যকর হয়নি মামলার রায়। বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আলোচিত এ মামলা।
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরায় বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। পরে তাকে অচেতন অবস্থায় ঢাকায় নেওয়া হয়। টানা আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ঢাকার সিএমএইচে মারা যায় শিশুটি। সেই ঘটনায় সারা দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
এ ঘটনায় ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন শিশুটির মা। এর এক মাস পর ওই বছরের ১৩ এপ্রিল আদালতে মামলার অভিযোগ পত্র জমা দেয় পুলিশ। এর ৩৪ দিন পর ১৭ মে ওই মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আসামি। এরপর থেকে গতিহীন মামলার কার্যক্রম।
শুধু এই চারটি মামলাই নয়, দেশে গত দুই দশকে খুন ও ধর্ষণের আলোচিত এমন অনেক ঘটনায় বিচার দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং সাজা কার্যকর হতেও বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে। এমন অবস্থায় রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দ্রুত বিচার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশের সব ধরনের আদালতে মামলাজট রয়েছে বলে জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন, যেসব মামলা নিয়ে খুব আলোচনা হয়, সেরকম কিছু মামলার বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ হয় নিম্ন আদালতে। বাকি মামলাগুলো নিম্ন আদালতেই ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।’
চলতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। এতে আরও বলা হয়েছে, অধস্তন আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে সময় লাগছে গড়ে তিন বছর সাত মাস।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, একই সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তিতে লাগছে দীর্ঘ সময়। আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ পান আসামি। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখলে বা অন্য কোনো রায় দিলে তা কার্যকর করার আগে রয়েছে বেশ কিছু দীর্ঘ আইনি ধাপ। যেগুলো শেষ না হলে সাজা কার্যকরের সুযোগ নেই। কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ যদি নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন, তারপরও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পান আসামি।
চূড়ান্ত রায়ে দীর্ঘসূত্রতা কেন- এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানিয়েছেন, অধস্তন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে আসে এবং রায়ের অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় নথিপত্র বা ‘পেপার বুক’ প্রস্তুত করতে হয়। পেপার বুক তৈরি করতে হয় সরকারকেই। সেটি তৈরি হয় সরকারি প্রিন্টিং প্রেস বা বিজি প্রেসে। পেপারবুক না হলে শুনানি হবে না। এটা করতে কখনো কখনো ১০ বছরও লাগতে পারে। সরকার পেপারবুক না করে দিলে, তখন এটা শুনানির কোনো সুযোগ নাই।
বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক। তিনি বলছিলেন, ‘ধরুন- হাইকোর্টের বেঞ্চ আছে ৬৫টা। সেগুলো থেকে যে রায় হচ্ছে সেগুলো কিছু যাচ্ছে আপিলে। সেগুলো আবার শুনানি হচ্ছে একটি বা দুইটি বেঞ্চে। যে কারণে মামলা শুনানিতে সময় লেগে যায়।’






