নামের মিলে কারাগারে থাকা আলমাসের মুক্তির পথ খুলল

ফাইল ছবি
দণ্ড নিয়ে কারাগারে থাকার কথা ছিল ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর গ্রামের মো. আলমাছের। কিন্তু পুলিশ ধরে আনে দোহারেরই কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সুন্দরীপাড়া গ্রামের মো. আলমাসকে।
এক বছর ধরে কারাগারে থাকা আলমাস যে আলমাছ নন, তা স্পষ্ট হওয়ার পর হাইকোর্টের আদেশ হয়েছে, মুক্তি দিতে হবে আলমাসকে।
আজ রবিবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন হানিফ, আলমাসের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ।
এর আগে হাইকোর্টে জমা হওয়া এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু নামের মিল থাকায় দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় গত এক বছর ধরে কারাগারে আছেন মো. আলমাস। আর দণ্ডিত আলমাছ পালিয়ে আছেন কানাডায়।
এক বছর আগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আলমাস উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেছিলেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারির পাশাপাশি কারাগারে থাকা আলমাস ও দণ্ডিত ব্যক্তির পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।
ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে বলা হয়েছিল। সেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয় গত বৃহস্পতিবার।
ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমানের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস এবং মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল হওয়া ৩২ নম্বর মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছ দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রিট আবেদনকারী আলমাসের বাবা শেখ খলিল, মা রশনারা বেগম। তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। আর পলাতক আলমাছের বাবার নাম খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল, মায়ের নাম সালমা আক্তার। তিনি ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত। তিনি এখন কানাডায় অবস্থান করছেন।
বাবা-মার পাশাপাশি আলমাস ও আলমাছের পিতামহ, ভাই-বোনের তালিকাও যে মেলে না, তাও উঠে আসে প্রতিবেদনে। দণ্ডিত আলমাছের রয়েছে তিন বোন। আর বন্দি আলমাসের আছেন দুই ভাই ও দুই বোন।
প্রতিবেদনে দুজনের বয়সের ফারাক তুলে ধরে বলা হয়, ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বয়স ছিল ২৪ বছর। সেই হিসাবে ২০০৬ সালে তার বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮। অথচ গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। সেই হিসাবে তার বর্তমান বয়স ৪১ বছর।
ভুল ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রথমত, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস সপরিবারে ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অন্যদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীন। ফলে ডাকঘরের নামে পরিচয় দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুজনের ঠিকানা এক হয়ে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উভয়ের বাবার নামে অনেকাংশে মিল ছিল। প্রকৃত আসামির বাবার নাম খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল। এই নামের সাদৃশ্য পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, ২০০২ সালে করা অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আলমাছের ঠিকানা ভুলক্রমে ‘পূর্ব ধোয়াইর’ এর স্থলে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়, যা পরবর্তী সময়ে নথিতেও বহাল থাকে। মামলার রায় শেষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও আসামি আলমাছের ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে দক্ষিণ বাহ্রা হয়ে যায়।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ।
অস্ত্র আইনের ওই মামলায় ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় দেন। রায়ে আলমাছের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। রায়ে তার বর্তমান ঠিকানা ছিল— আহমেদনগর, পাইকপাড়া, মিরপুর। অন্য আসামি নাজমুল খালাস পান।
রায়ের সময় আলমাছ ছিলেন পলাতক। তার নামে সাজা পরোয়ানা জারি হয়। ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে আলমাসকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত বছরের ৫ নভেম্বর আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।



