প্রবাসী যুবকটি জানতেন না, নারীর কণ্ঠের আড়ালে ছিল এক পুরুষ

সংগৃহীত ছবি
ছবিতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা এক নারী। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি, চোখে-মুখে দৃঢ়তা। ফেসবুকের ‘লেডি সোলজার/নারী যোদ্ধা’ পেজে এমনই ছবি দেখে আকৃষ্ট হন ইতালিপ্রবাসী তরুণ শাহাদাত খান। এরপর সামাজিকমাধ্যমে পরিচয়, ইমোতে নারী কণ্ঠে নিয়মিত চলত কথোপকথন। ধীরে ধীর সেই পরিচয় গড়ায় প্রেমে। দূর প্রবাসে থাকা ২২ বছরের তরুণের কাছে তখন ওপারের মানুষটি হয়ে ওঠেন আপনজন। কথার ফাঁকে আসে অসুস্থতার গল্প, কখনো নিজের, কখনো মায়ের। আবেগে সাড়া দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন শাহাদাত খান। একবার নয়, বারবার। বিকাশ আর নগদের মাধ্যমে যেতে থাকে টাকা। এভাবে প্রায় ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে খুলতে থাকে রহস্যের জট।
যাকে এতদিন নারী সেনাসদস্য ভেবে প্রেমে পড়েছিলেন শাহাদাত, তিনি আসলে কোনো নারী নন। পুরো পরিচয়টাই ছিল প্রতারণার ফাঁদ। আর সেই ফাঁদের কারিগর তোফায়েল আলম টিটু নামে এক পুরুষ। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ছবি, নারীসুলভ কণ্ঠ এবং আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রেমের জাল পেতে প্রবাসী যুবকের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে টিটুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার দারুস সালাম এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের সিমসহ তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
আজ রবিবার পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ। তিনি জানিয়েছেন, কেরানীগঞ্জের বারিশুর বাঘবাড়ি এলাকার শাহনাজ বেগমের ছেলে শাহাদাত খান ইতালিতে থাকেন। ফেসবুকে ‘লেডি সোলজার/নারী যোদ্ধা’ নামের একটি পেজের মাধ্যমে কথিত এক নারী সেনাসদস্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যের পোশাক পরা ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হতো। ছবি দেখে শাহাদাতের কাছে ওই ব্যক্তির পরিচয় ছিল একজন নারী সেনাসদস্য হিসেবে। পরে ইমোতে শুরু হয় কথাবার্তা। আর সেখানেই প্রতারণার সবচেয়ে বড় কৌশলটি কাজে লাগান টিটু। তিনি নারীসুলভ কণ্ঠে শাহাদাতের সঙ্গে কথা বলতেন। ফলে ছবির সঙ্গে কণ্ঠেরও মিল খুঁজে পান ওই তরুণ। সন্দেহের অবকাশ না থাকায় ধীরে ধীরে তৈরি হয় গভীর বিশ্বাস।
তিনি বলেন, তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, শাহাদাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার পর বিভিন্ন অজুহাতে টাকা চাইতে শুরু করেন টিটু। কখনো নিজের অসুস্থতার কথা, কখনো মায়ের অসুস্থতার কথা বলে অর্থ সহায়তা চান। শুধু শাহাদাত নয়, তার মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন তিনি। অসুস্থতার কথা বলে তার কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়। বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে চলতে থাকে লেনদেন।
কিন্তু প্রতারণার জাল যত গভীর হয়েছে, ততই বাড়তে থাকে সন্দেহ। কথিত নারী সেনাসদস্যের আচরণ ও পরিচয়ে অসংগতি খুঁজে পান শাহাদাত ও তার পরিবার। ঘটনাটি বুঝতে পেরে শাহাদাতের মা শাহনাজ বেগম আদালতে সিআর মামলা করেন। পিবিআই ওই সিআর মামলার তদন্তকালে প্রতারণার প্রমাণ পায় এবং বিকাশ ও নগদ লেনদেনের তথ্য সংগ্রহসহ সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করে। এসময় কেরানীগঞ্জ থানায়ও একটি মামলা করেন ভুক্তভোগী। পিবিআই বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন ডকুমেন্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্তকারীরা টিটুর অবস্থান শনাক্ত করেন। অবশেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার দারুস সালাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে টিটুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তারের পর ২১ সেপ্টেম্বর টিটুকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর টিটু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। টিটুর বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ আদালতে সিআর মামলা নম্বর-৪৫৩/২৫ রয়েছে। ওই মামলার তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে আদালত ওয়ারেন্ট জারি করেছেন বলেও জানা গেছে। পিবিআই বলছে, টিটুর সঙ্গে এই প্রতারণায় অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, আত্মসাৎ করা অর্থের আরও কোনো অংশ কোথায় গেছে এবং এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে তার অন্য কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।




