মাঠ কমেছে ৮০ ভাগ, ৫ ঘণ্টাই স্ক্রিনে চোখ
- রাজধানীর দুই সিটির ৪১ ওয়ার্ডে নেই খেলার মাঠ
- ঢাকায় মাঠ দরকার ৬১০টি, আছে ২৫৬টি
- ৮৪ শতাংশ এলাকার মানুষ মাঠের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত

বিকালের সোনালি আলোয় একসময় মুখর থাকত পাড়ার মাঠ। ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলার দৌড়ঝাঁপে কেটে যেত শৈশব। চিরচেনা সেই দৃশ্য আজ যেন শুধুই স্মৃতির অ্যালবামে আটকে। কংক্রিটের শহর ঢাকায় খেলার মাঠ এখন বিরল। যে শূন্যতা পূরণ করছে ছোট্ট এক ডিজিটাল স্ক্রিন। শৈশবের সোনালি বিকালগুলো বন্দি হয়ে গেছে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপের কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিনে। খেলার মাঠের অভাব ও পারিবারিক ব্যস্ততায় রাজধানী ঢাকার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এখন চরম ঝুঁকিতে।
ইট-কাঠের এই তিলোত্তমা নগরীতে মাঠের অভাব আর প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের স্বাভাবিক চঞ্চলতা। ঢাকার শিশুরা একাকী বড় হচ্ছে ঘরের কোণে। তাদের সঙ্গী কেবল ডিজিটাল ডিভাইস। যাতে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের চেনা আনন্দ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য রীতিমতো উদ্বেগজনক। ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটায় ডিজিটাল স্ক্রিনে। প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনই (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন দেখে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
মাধ্যমভেদে এই আসক্তির চিত্রে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বাংলা মাধ্যমের শিশুদের গড় স্ক্রিন টাইম যেখানে ৩ দশমিক ৬৭ ঘণ্টা, সেখানে ইংরেজি মাধ্যমের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার গড়ে ৫ দশমিক ৪৬ ঘণ্টা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) খসড়া অনুযায়ী, ঢাকার ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে নেই কোনো খেলার মাঠ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির ১০টি এবং দক্ষিণ সিটির ৩১টি ওয়ার্ড সম্পূর্ণ মাঠশূন্য।
যদিও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে অন্তত একটি মাঠ থাকা প্রয়োজন। ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটারের ঢাকায় মাঠ দরকার অন্তত ৬১০টি। কিন্তু বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২৫৬টি। এর মধ্যে অন্তত ২০টি মাঠের আয়তন এক একরেরও কম।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য একটি মাঠ প্রয়োজন। প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষের এই শহরে মাঠ প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ৪৬৬টি। কাগজে-কলমে যে ২৫৬টি মাঠ দেখানো হয়, তার প্রায় ৭০ শতাংশই বিভিন্ন ক্লাব, মার্কেট বা মেলার দখলে। কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ থাকায় সেখানে সাধারণ শিশুদের নেই প্রবেশাধিকার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৮৪ শতাংশ এলাকার মানুষ মাঠের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। গত ৫০ বছরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ ও অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে ঢাকা শহরের খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। নির্দিষ্ট করে ৫০ বছরের কোনো একক ধারাবাহিক সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও বিআইপি, রাজউক এবং বিভিন্ন নগর গবেষণা সংস্থার গত কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে রাজধানীতে মাঠের সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। গবেষণা ও জরিপের তথ্য বলছে, ঢাকা শহরের আসল বিপর্যয়টি ঘটেছে গত ২০ থেকে ২৫ বছরে। ২০০০ সালের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়েও ঢাকা শহরে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও ব্যবহারযোগ্য খেলার মাঠ ছিল প্রায় ১৫০টি। কিন্তু ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্য বলছে, বর্তমানে দুই সিটি
করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার আছে— এমন উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ থেকে ৪২টির মধ্যে। অর্থাৎ, শুধু গত দুই দশকেই ঢাকা থেকে ১২০টির মতো মাঠ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে বা সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। শতকরা হারে ২০০০ সালের তুলনায় গত দুই দশকে ঢাকার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠ কমেছে ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশ।
মাঠের অভাবে ১৩ বছর বয়সী কিশোর আরশানের শৈশবের বড় সময় কাটছে স্ক্রিনে। আরশানের বাবা আতাউর রহমান এক বুক হতাশা নিয়ে আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ঢাকায় খেলার মাঠ নেই, ঘোরার জায়গা নেই। যানজটে মানুষ নাকাল— ইচ্ছা থাকলেও সন্তানকে নিয়ে বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বাচ্চারা বাইরে মুক্ত বাতাসে খেলতে পারছে না বলেই ঘরে বসে মোবাইলে গেম, কার্টুনে ডুবে আছে।’
ফাতেমা আক্তার শিমু। পেশায় একটি হাসপাতালের সেবিকা। তার ৬ বছর বয়সী ছেলে আনহাফ। কর্মজীবী হওয়ার কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না তিনি। বললেন, ‘চাকরি করার ফলে বাচ্চাকে বেশি সময় দিতে পারি না। যার কারণে বেশিরভাগ সময় ও মোবাইলে আসক্ত থাকে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতে চায় না।’
চিকিৎসক ও মনোবিদরা শিশুদের এমন ডিজিটাল আসক্তির জন্য অভিভাবকদের অসচেতনতা ও জীবনযাত্রার পদ্ধতিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, শিশুদের শান্ত রাখতে কিংবা কান্নাকাটি থামানোর জন্য মায়েরা কৌশল হিসেবে শিশুর হাতে ধরিয়ে দেন মোবাইল ফোন। বিশেষ করে খাওয়ানোর সময় এই প্রবণতা দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। অনেক শিশুই মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, বাড়ছে ওজন। দেখা দিচ্ছে চোখের সমস্যা, হচ্ছে মাথাব্যথা। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে নেতিবাচক খারাপ প্রভাব।
গবেষণার তথ্য কী বলছে: গবেষক সাইদা আহমেদ। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে প্রকাশিত তার ‘সেল ফোন ইউজ অ্যান্ড সেলফ রিপোর্টেড ওয়েবলিং অ্যামাং টিনএজ স্টুডেন্ট অব বাংলাদেশ’ গবেষণাপত্রে ঢাকার ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন। যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছর। এই গবেষণাপত্রে তিনি দেখান, শিক্ষার্থীরা দৈনিক ৬ ঘণ্টার ওপর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম ও তার সহপাঠীরা মিলে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০০ শিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করেন। যার শিরোনাম ছিল ‘অ্যাসেসমেন্ট অব স্লিপ কোয়ালিটি অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ প্রবলেমেটিক ইন্টারনেট ইউজ অ্যামাং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট’। এতে দেখা যায় মাত্রাতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সময় কাটায় এমন শিক্ষার্থীদের ৭২ শতাংশই ঘুমের সমস্যা অনুভব করে।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় কাটানো এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু ভুগছে চোখের সমস্যায়। আর ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই ভুগছে মাথাব্যথায়। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর ফেলতে পারে নেতিবাচক প্রভাব।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে দুটি শিশু দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য স্ক্রিনের বিকল্প হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক খেলাধুলা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। সংস্থাটির মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গঠনে স্থায়ী ক্ষতি করছে। চোখের রেটিনা এবং মনোযোগ ক্ষমতার তীব্র ক্ষতি করে এবং ৩ ঘণ্টা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কার্যকলাপে ব্যস্ত রাখা উচিত। বিশেষ করে শিশুদের বাইরের খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম ও ডিজিটাল ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করতে হবে। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘একটি বাসযোগ্য শহরের জন্য খেলার মাঠ কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানী ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-পঞ্চমাংশ (পাঁচ ভাগের এক ভাগ) খেলার মাঠও অবশিষ্ট নেই। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে কয়েকটি মাঠ সচল রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই কৃত্রিম রূপ ধারণ করেছে এবং সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের সেখানে টাকা দিয়ে খেলতে হচ্ছে। রাজধানীর মাঠস্বল্পতায় শিশু বা কিশোররা ডিজিটাল স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ছে।’
মাঠের খেলাধুলা ছেড়ে সার্বক্ষণিক মোবাইল স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকায় দেশের শিশুরা তীব্র শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। অতিরিক্ত ডিভাইস আসক্তির ফলে শিশুরা ‘ডিজিটাল ডিমেনশিয়া’ বা ভুলে যাওয়ার প্রবণতাসহ আক্রান্ত হচ্ছে নানা আচরণগত রোগে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লবের মতে স্ক্রিন আসক্তির কারণে দেশের শিশুদের বড় একটি অংশ মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।
তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বাইরে না খেললে শিশুদের শারীরিক গঠন পরিপূর্ণ হয় না। মানসিক বিকাশও থমকে যায়। মাঠে খেললে শিশুরা প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও সামাজিক হতে শেখে। কিন্তু স্ক্রিন আসক্তির কারণে শিশুরা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মিশছে না, মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে। চাহিদা পূরণ না হলে পরিবারের সঙ্গে চরম বিশৃঙ্খলা করছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বড় বিপদের আশঙ্কায় মা-বাবারাও এখন সন্তানদের ভয় পাচ্ছেন।’
এই সংকট থেকে উত্তরণে করণীয় কয়েক বিষয়ও তুলে ধরেন এই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। বললেন, ‘শিশুদের হাতে ফোন না দেওয়াই ভালো। ছোটবেলা থেকেই তাদের বিভিন্ন সামাজিক ও শারীরিক কার্যকলাপে ব্যস্ত রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও সরকারকে এখনই সচেতন হতে হবে। ঢাকা শহরসহ দেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহরে শিশুদের জন্য অবিলম্বে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ খেলার মাঠ তৈরি করা জরুরি।’




