এক বিকালের ক্যাম্পাসে ৬০০ তরুণের স্বপ্ন

এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শিক্ষার্থীরা—ছবি : আগামীর সময়
দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ঘড়ির কাঁটা তিনটা পেরিয়েছে। মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ব্যস্ত সড়কের শব্দ ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পর সামনে দেখা গেল এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজের মূল ফটক। ফটক পেরিয়েই মনে হলো, এটি যেন আর দশটা দিনের কলেজ নয়। কোথাও রঙ-তুলির আঁচড়, কোথাও বিজ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী। কেউ ছবি আঁকছেন, কেউ নিজেদের তৈরি প্রকল্প নিয়ে দর্শনার্থীদের বোঝাচ্ছেন। পুরো প্রাঙ্গণে একধরনের উৎসবের আবহ।
মূল ফটক দিয়ে ঢুকেই হাতের বামে চোখ আটকে গেল কয়েকজন শিক্ষার্থীর দিকে। মেঝেতে বসে আছেন। তাদের সামনে রঙ-তুলি আর নানা রঙের কৌটা। গালে, হাতে আবার কেউ চোখের কোণে রঙ-তুলিতে নানান ছবি আঁকছেন। কারও ছবিতে ইতিহাস, কারও ছবিতে গ্রামবাংলা। কেউ আবার নিজের পছন্দের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলছেন। কৌতূহল নিয়ে কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, এখানে কী হচ্ছে? কথা হলো সুবহার সঙ্গে। তিনি এই কলেজের আর্ট ক্লাবের মানবসম্পদ সংগঠক। জানালেন, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে তারা ছবি আঁকছেন। শুধু কলেজের শিক্ষার্থীরাই নন, বাইরের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছেন। কেউ চাইলে নিজের পছন্দের বিষয় বলেও ছবি আঁকিয়ে নিতে পারেন। এর জন্য নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা শুভেচ্ছা মূল্য।
কথা শেষ করে সামনে এগোতেই আরেকটি দৃশ্য থামিয়ে দিল। ডেইজি চতুর্থ শ্রেণির শাখার পাশের দেয়ালে সারি সারি ছবি। প্রতিটি ছবির আলাদা গল্প। তবে একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হলো। ছবিতে তিন নারী। পেছনে গ্রামীণ পরিবেশ। দুজন নারী স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তৃতীয় নারীর মুখ হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে আছেন একজন। ছবিটি যেন কোনো শব্দ ছাড়াই একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—নারী কি সত্যিই নিজের কথা বলতে পারেন? ছবিটির শিল্পী তাসনুবা মাহবুবা মালিহা। তার ছবির বার্তা আরও গভীর। সমাজে নারীরা অনেক সময় কথা বলতে চাইলেও তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করতে গেলেও মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই নীরবতার দৃশ্যই তিনি রঙ ও তুলিতে এঁকেছেন।
দেয়ালের দিকে তাকালে শুধু একটি ছবিই নয়, চোখে পড়ে পুরো বাংলার একটি চিত্রপট। বৈশাখের উৎসব, নবান্নের আনন্দ, পিঠা উৎসব, পুতুল নাচ, লালনের আখড়া—সবকিছুই জায়গা পেয়েছে শিক্ষার্থীদের ক্যানভাসে। রঙের ভেতর দিয়ে যেন গ্রামবাংলার পরিচিত গন্ধ আর উৎসবের আমেজটাও অনুভব করা যায়। তবে এই আয়োজন শুধু শিল্পে থেমে নেই। কয়েক পা এগোলেই বদলে যায় দৃশ্য। সেখানে রঙ-তুলির বদলে দেখা যায় বিজ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত তরুণদের।
জিনিয়া নামের একটি শ্রেণিকক্ষে প্রদর্শন করা হয়েছে হাতে আঁকা বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য। দেয়াল জুড়ে নানা বিষয় সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একটি বোর্ডে ‘অরেঞ্জ ডোনেশন’সহ বিভিন্ন বিষয় সুন্দরভাবে সাজানো। দেখে মনে হয়, বইয়ের পাতায় থাকা কঠিন বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে। পাশের ডালিয়া কক্ষেই আরও বড় আয়োজন। বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা নিয়ে এসেছে নিজেদের তৈরি প্রকল্প। এক কোণে বসেছিল আদমজী স্কুলের সপ্তম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী। টিম লিডার ফারহান মাসুক। সঙ্গে রাইয়ান ও মারজুক। তাদের সামনে রাখা একটি যন্ত্র। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই, এটি আসলে কী।
কাছে যেতেই ফারহান ব্যাখ্যা শুরু করল। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহের যন্ত্র। চালক চাইলে এটি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। আবার প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেও চলবে। প্রকল্পটি তৈরি করতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় ছয় মাস। ফারহানের চোখে-মুখে তখন নিজের তৈরি শিল্প নিয়ে আত্মবিশ্বাস। তার দাবি, কমিউনিটিতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যাটারি চার্জ করতে খরচ হয় মাত্র ১৫ টাকা। প্রচলিত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় যেখানে জ্বালানিতে বেশি খরচ হয়, সেখানে তাদের তৈরি যন্ত্রটি কম খরচে সেবা দিতে পারে। পরিবেশের জন্যও এটি তুলনামূলকভাবে ভালো। একটি ছোট্ট প্রকল্প। কিন্তু এর পেছনে ছয় মাসের পরিশ্রম। সপ্তম শ্রেণির তিন শিক্ষার্থীর হাতে তৈরি সেই যন্ত্রটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হয়তো এমন ছোট ছোট চিন্তা থেকেই তৈরি হবে।
আরেক পাশে দেখা গেল নটর ডেম কলেজের ওমর ফারুককে। তার হাতে একসঙ্গে কয়েকটি সাফল্যের গল্প। বিজ্ঞান গল্প লেখা, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও সংখ্যা অলিম্পিয়াড—তিনটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে দুটিতে বিজয়ী, অন্যটিতে রানারআপ। কীভাবে এলেন? সহজ উত্তর—ফেসবুকে আয়োজনটির খবর দেখে আবেদন করেছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলেন। বন্ধুরা চলে গেলেও তিনি রয়ে গেছেন। কারণ নিজের অর্জনের আনন্দটা একটু বেশি সময় ধরে উপভোগ করতে চেয়েছেন হয়তো।
এই আনন্দ শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। অভিভাবকদের চোখেও তার ছাপ দেখা গেল। কথা হলো সরকারি কর্মকর্তা রানা আহমেদের সঙ্গে। তার ছেলে হাসান আহমেদ আরিফ পড়ে ঢাকা সেনানিবাসের নির্ঝর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজে। স্কুলের মাধ্যমে আয়োজনের খবর পেয়ে ছেলে অংশ নেয়। পরে বিজয়ীও হয়। বাবা হিসেবে ছেলের সাফল্য তাকে আনন্দ দিয়েছে। কথার সময় তার কণ্ঠেও সেই গর্ব স্পষ্ট।
এই পুরো আয়োজন ঘুরে দেখাতে সঙ্গে ছিলেন অনিরুদ্ধ পোদ্দার অর্প। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যেতে যেতে বারবার নতুন কিছু চোখে পড়ছিল। কোথাও ইতিহাস, কোথাও সমাজের কথা, কোথাও বিজ্ঞানের কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা। আবার কোথাও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির স্বপ্ন।
আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিন দিনের এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে ৫০টি কলেজ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৬০০ জন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও রানারআপদের দেওয়া হবে পুরস্কার ও সনদ।
বিকাল তখন আরও গড়িয়ে গেছে। কলেজের করিডরে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে। কিন্তু দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো তখনো যেন কথা বলছে। কোথাও নীরব করে দেওয়া নারীর মুখ, কোথাও উৎসবমুখর গ্রামবাংলা। আবার কোনো কক্ষে ভবিষ্যতের যন্ত্র নিয়ে ব্যস্ত কিশোররা। কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় মনে হলো, কয়েক ঘণ্টায় আসলে একটি প্রদর্শনী দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে তরুণদের ভাবনার একটি ছোট্ট পৃথিবী। কারও হাতে রঙ-তুলি, কারও হাতে প্রযুক্তির যন্ত্র। কেউ অতীতকে আঁকছে, কেউ ভবিষ্যৎ বানানোর চেষ্টা করছে। আর এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের শিক্ষার্থীরা—যারা ইতিহাসকে জানতে চায়, সমাজকে প্রশ্ন করতে চায় এবং নিজের হাতে ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়।
এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজে গত ১৩ আগস্ট শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘১৯তম ফেস্টিভাল ডেল ইগনিস ইনজেনাই’। আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) উৎসবের শেষ দিনে চোখে পড়ে এসব দৃশ্য। পুরো আয়োজনটির মিডিয়া পার্টনার দৈনিক আগামীর সময়।
উৎসবের প্রথম দিনে ছিল উপস্থিত বক্তৃতা, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি রচনা, রুবিক’স কিউব মেলাকাটা, মানব ক্যালকুলেটর ও আইকিউ টেস্টসহ বিভিন্ন আয়োজন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে ছিল গেমিং ইভেন্ট, কুইজ, অলিম্পিয়াড, ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী, দেয়াল পত্রিকা, প্রজেক্ট প্রদর্শনী ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা।










