বাসার ভেতরে কুশ চাষের ল্যাব
- যুক্তরাষ্ট্রে বসে ঢাকায় কুশের সাম্রাজ্য, ‘মাস্টারমাইন্ড’গ্রেপ্তার
- ক্যালিফোর্নিয়ায় শিখে দেশে গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক ল্যাব
- বিদেশে থেকেও প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রণ করতেন মাদক উৎপাদন

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে বসে ঢাকার ওয়ারীতে নিজের বাসায় গড়ে তুলেছিলেন কুশ উৎপাদনের অত্যাধুনিক ল্যাব। বিদেশ থেকে আনা বীজে বিশেষ ব্যবস্থায় চাষ হতো অপ্রচলিত সিনথেটিক মাদক কুশ। শুধু তা-ই নয়, দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বসেই নিয়ন্ত্রণ করতেন ল্যাবের তাপমাত্রা ও উৎপাদন কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন এই চক্রের মূল হোতা তৌসিফ হাসান (২২)। অবশেষে দেশে ফিরে নিজের বাসা থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনি।
আজ রবিবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান। তিনি জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে রাজধানীর ওয়ারীর র্যাংকিন স্ট্রিটের বাসায় অভিযান চালিয়ে তৌসিফকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়। তৌসিফ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে জানিয়েছে ডিএনসি।
ডিএনসি সূত্র জানায়, গত জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের চেষ্টার ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে তৌসিফের নাম সামনে আসে। সেই সূত্র ধরে ওয়ারীর বাসায় অভিযান চালিয়ে মাদক উৎপাদনের এক অপ্রচলিত ব্যবস্থার সন্ধান পান গোয়েন্দারা। বাসার ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল কুশ চাষের ল্যাব। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আনা কুশের বীজ, চাষ করা গাছ, সদ্য সংগৃহীত কুশ এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পাওয়া যায় সিসা সেবনের সরঞ্জাম ও বিদেশি মদও। বাসার ছাদেও ছিল কুশ চাষের বিশেষ আয়োজন। টিন ও ফয়েল পেপার দিয়ে তৈরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে একাধিক টবে চলছিল কুশের চাষ। সব মিলিয়ে একটি সাধারণ আবাসিক ভবনের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছিল মাদক উৎপাদনের বিশেষায়িত ব্যবস্থা।
ক্যালিফোর্নিয়ায় শেখা কৌশল, ঢাকায় গোপন ল্যাব: তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ডিএনসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থানকালে কুশ চাষের কৌশল রপ্ত করেন তৌসিফ। পরে দেশে ফিরে নিজের বাসায় বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করে শুরু করেন কুশ উৎপাদন। বিদেশে অবস্থান করেও দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সাহায্যে ল্যাবের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন তিনি। এ কাজে তার এক বান্ধবী সহযোগিতা করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ওই বান্ধবীর মাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে ৩২টি ইয়াবা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনসির অভিযানে চালানটি উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় ওই বান্ধবী ও তৌসিফের বাসার তত্ত্বাবধায়ককে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা হয়। সেই মামলায় তৌসিফকে পলাতক আসামি করা হয়েছিল।
ডোপ টেস্টে দুই মাদকের উপস্থিতি
দীর্ঘদিন ধরে মামলার মূল অভিযুক্ত তৌসিফকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল ডিএনসি। অবশেষে রবিবার অভিযানে তার সেই অপেক্ষার অবসান হয়। গ্রেপ্তারের পর তৌসিফের ডোপ টেস্ট করা হলে পরীক্ষায় মেথামফিটামিন ও ক্যানাবিনয়েড, উভয় উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে ডিএনসির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ সময় তার কাছ থেকে ১০টি মেথামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০০ গ্রাম গাঁজা এবং ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তৌসিফ ঢাকার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ইয়াবা ও কুশ সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ডিএনসি। তার মাদক সংগ্রহ ও সরবরাহের উৎস, কারা তার কাছ থেকে মাদক নিতেন এবং এই চক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় ওয়ারী থানায় তৌসিফের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি কুশ ল্যাবসংক্রান্ত আগের মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো এবং রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে ডিএনসি।



