পশুর হাটে এখন নিমের সুবাস!

পশুর হাট শেষ। লাভ-লোকসানের খতিয়ান চুকিয়ে পকেটে টাকা পুরে ইজারাদার বিদায়। পেছনে পড়ে আছে ক্ষতবিক্ষত মাঠ, আধভাঙা রাস্তা আর পশুর মলমূত্র। দুর্গন্ধে দমবন্ধ হওয়ার জোগাড়। কোরবানির পশুর হাট শেষ হতে না হতেই প্রতিবছর রাজধানীতে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। অন্যদিকে বরাবরের মতো সেই বর্জ্যের পাহাড় সরানো আর মাঠ ঠিকঠাক করার দায় গিয়ে পড়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ঘাড়ে।
এবারও কোরবানির পর রাজধানীর আর সব পশুর হাটের চিত্র এমনটিই ছিল। ব্যতিক্রম তেজগাঁও হাট। এই হাটের ইজারাদার আমিনুল ইসলাম এবার চেনা ও মলিন অভ্যাসের দেয়ালে এক ঝলক দখিনা হাওয়া নিয়ে এসেছেন। তিনি শুধু হাট বসানোর মাঠটি আগের অবস্থায় ফিরিয়েই দেননি; বরং মাঠের চারপাশে এবং আশপাশের এলাকায় রোপণ করেছেন ৫০০টি ঔষধি গুণসম্পন্ন নিমগাছের চারা। এখানেই শেষ নয়; আগামী এক বছরে তেজগাঁও এলাকায় তিনি নিমসহ অন্যান্য মিলিয়ে মোট পাঁচ হাজার গাছের চারা রোপণের মহোদ্যোগ নিয়েছেন।
আমিনুল ইসলামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ রাজধানীর ইট-পাথর আর কংক্রিটের খাঁচায় এক সবুজ বিপ্লবের বার্তা দিচ্ছে। আর এই পুরো পদক্ষেপকে গ্রহণযোগ্য করেছে চিরসবুজ ও বহু গুণে গুণান্বিত নিমগাছ। কারণ বাঙালির সনাতনি চিকিৎসাবিজ্ঞান বা আয়ুর্বেদে নিমকে বলা হয় ‘সর্বরোগ নিবারণী’। একটি নিমগাছ বাড়ির আঙিনায় থাকা মানে সার্বক্ষণিক একজন চিকিৎসকের উপস্থিতি। এটিকে প্রকৃতির নিজস্ব চিকিৎসালয়ও বলা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রান্তিলগ্নে এবং মেগাসিটি ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে নিমের গুণাগুণ অপরিসীম।
তেজগাঁওয়ের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিল্প এলাকায় বাতাসে যেখানে প্রতিনিয়ত সিসা আর ধূলিকণার রাজত্ব, সেখানে আমিনুল ইসলামের এই ৫০০ নিমগাছ ভবিষ্যতে একেকটি প্রাকৃতিক ‘এয়ার পিউরিফায়ার’ হিসেবে কাজ করবে। বাতাস থেকে বিষাক্ত গ্যাস শুষে নিয়ে নগরবাসীকে দেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। শুধু কি বায়ুশোধন? পশুর হাটের পর যে মশা, মাছি কিংবা জীবাণুর উপদ্রব বাড়ে— নিমপাতার তীব্র তেতো গন্ধ আর প্রাকৃতিক কীটনাশক গুণ তা নিমেষেই দূর করতে সক্ষম। অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালে ঢাকার তাপমাত্রা যখন মরুভূমির রূপ নেয়, তখন নিমের ঘন সবুজ পাতা চারপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনতেও সাহায্য করে।
তেজগাঁও হাটের মাঠ সংস্কারের পর এই সবুজায়নের বিষয়ে ইজারাদার আমিনুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু পরিবেশের প্রতিও আমাদের একটা বড় দায় রয়েছে। তাই মাঠ পরিষ্কার করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই নিমগাছ লাগানোর।’ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে হাটে আসা ব্যবসায়ী এবং পশুর কষ্ট দেখে তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। যাতে আগামী বছরগুলোতে হাটের ব্যবসায়ী বা ক্রেতারা নিমের ছায়ায় স্বস্তিতে পশু বেচাকেনা করতে পারেন, সেটাই আমিনুলের লক্ষ্য। পাশাপাশি পুরো তেজগাঁও এলাকায় এই ‘নিম-বিপ্লব’ ছড়িয়ে দিলে তা রাজধানীর তপ্ত পরিবেশে কিছুটা শীতলতা নিয়ে আসবে। সেখান থেকেই তিনি আরও বৃহৎ পরিসরে নিমগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেন।
আগামীর সময়কে আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আপাতত রোপণ করা এসব নিমগাছের রক্ষণাবেক্ষণ তার নিজের লোকেরাই মিলেমিশে করছে। তবে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সম্মানী দিয়ে পরিচর্যার জন্য কিছু লোক নিয়োগ করবেন তিনি।
এদিকে, আমিনুল ইসলামের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। সাধারণত যেখানে হাটের পর ইজারাদারদের খোঁজার জন্য নোটিস পাঠাতে হয়, সেখানে একজন ইজারাদারের এমন পরিবেশবান্ধব চিন্তা প্রশংসার দাবিদার। নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বলেছেন, আমিনুল ইসলামের এই উদ্যোগ ঢাকার অন্যান্য ইজারাদারের গালে মৃদু চপেটাঘাত। রাজধানীর প্রতিটি পশুর হাটের ইজারাদার এমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলে প্রতিবছর ঈদের পর ঢাকাকে এক নোংরা নগরী হিসেবে দেখতে হতো না; বরং রাজধানী হতো সবুজ, শ্যামল।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অনুমতি নিয়ে নিজ উদ্যোগে নিমের চারা রোপণকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। প্রথম দিন নিমের চারা রোপণে অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, আমিনুল ইসলামের মতো ডিএনসিসি এলাকায় আর কেউ গাছ লাগাতে চাইলে সিটি করপোরেশন অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করবে।






