তাহসিফের বাবা
লোকজন ধাওয়া দিতে যাবে কেন, এগুলো বাজে কথা

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম।
পুলিশের বা একদল লোকের ধাওয়া খেঁয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন— পিবিআইকে দেওয়া আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের এমন ভাষ্যের প্রতিক্রিয়ায় আজ শুক্রবার এ অভিযোগ করেন তিনি।
এনায়েতুল করিম বলেছেন, ‘তাহসিফ সাউরি সাঁতার জানতেন। শুধু তা-ই নয়, পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্সও করেছিলেন। ছিল সেই কোর্সের আছে সনদও।’
দ্বীপের দেওয়া নদীতে ঝাঁপের তথ্য মানতে নারাজ তিনি। উল্টো দাবি করেছেন, কেন লোকজন তাহসিফকে ধাওয়া দিতে যাবে? ‘এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দ্বীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’—মাকে এ কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি জুলাই গণঅভুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা বিমানবাহিনীর সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট।
পরদিন বুধবার তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মরদেহ নিতে এসে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম বলেন, ‘তার ছেলে আত্মহত্যা করার মতো মানুষ না। তাহসিফকে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলা হয়েছে।’
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাহসিফ সাউরি ‘বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌ পুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও ছায়া তদন্ত করছে। তদন্তের অংশ হিসেবে দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।
পিবিআইকে দেওয়া দ্বীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা দুজন উত্তরা থেকে মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর একপর্যায়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেন দ্বীপ। তাকে না পেয়ে একাই মোটরসাইকেল নিয়ে বাসায় ফিরে যান। তবে দুজন একসঙ্গে সেখানে যাওয়ার পর কীভাবে আলাদা হলেন, তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে দীপ কেন একাই ফিরে গেলেন এবং ধাওয়ার ঘটনা ঘটলে সেটি তিনি আগে কেন জানাননি, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘দীপের দেওয়া সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সে বলছে, পুলিশের পোশাক পরা কেউ তাদের ধাওয়া দিয়েছিল। কারা ধাওয়া দিয়েছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তারা মাদকাসক্ত ছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। অনেক কিছুই সে বলেছে, তবে সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে দ্বীপের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জানায়, ঘটনার রাতে দ্বীপ রাত দেড়টার দিকে ফোন করে তাকে জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হবে। পরে রাত আড়াইটার দিকে তিনি বাসায় প্রবেশ করেন। অথচ এর আগে গণমাধ্যমে দীপ দাবি করেছিলেন, রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তিনি তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন এবং এরপর বাসায় চলে যান। এই দুই বক্তব্যের সময়ের অসংগতি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফও মাকে ভয়েস মেসেজ দিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। তাহলে কি ওই সময় দুজন একই জায়গায় ছিলেন?
তবে তাহসিফের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবার থেকে এখন কোনো মামলা বা অভিযোগ করবেন না বলে জানানো হয়। কিন্তু দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্ট হওয়া ও সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ায় পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছে পিবিআই, ডিবি, নৌ-পুলিশসহ নানা গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।
তাহসিফ সাউরির বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, ‘মামলা করার বিষয়ে আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি। পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। মামলা করা মানেই আদালতে দৌড়াদৌড়ি, নানা ধরনের ঝামেলা। কে আর স্বেচ্ছায় এসব ঝামেলায় জড়াতে চায়?’
‘তাহসিফ যেহেতু বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাই আশা করি, সরকার তার মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে। তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর পেছনে দায়ীদের শনাক্ত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা’, যোগ করেন তিনি।
মামলার বিষয়ে নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘তাহসিফের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’






