পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে সরকারের ‘গোপনীয়তা’ কেন, সেমিনারে প্রশ্ন

প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে সরকারের ‘গোপনীয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতিসংঘের সাবেক উন্নয়ন গবেষণা প্রধান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। একই সঙ্গে প্রকল্পটির নাম ‘পদ্মা ব্যারেজ’ করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
আজ শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাপা ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) আয়োজিত এক সেমিনারে এসব প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারেজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি ও বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির।
প্রকল্প নিয়ে তথ্য প্রকাশের দাবি
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম তার প্রবন্ধে বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রস্তাবিত ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে থাকার কথা রয়েছে। এই ব্যারেজ নির্মিত হলে পানখা—বাংলাদেশের যে সীমান্তবিন্দু দিয়ে গঙ্গা ভারত থেকে প্রবেশ করেছে—সেখান থেকে পাংশা পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশে গঙ্গার পানির উচ্চতা ১২ দশমিক ৫ মিটার রাখা সম্ভব হবে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এর ফলে গঙ্গানির্ভর এলাকার পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং নদ-নদীতে প্রবাহ বাড়ার কারণে সামগ্রিকভাবে পরিবেশের উন্নতি হতে পারে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের কাছে থাকা তথ্য দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বললেন, আগের সরকারও এ প্রকল্প নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বচ্ছতা দেখিয়েছিল। প্রকল্পের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে মতামত চাওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারও কেন একইভাবে তথ্য প্রকাশ করছে না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, প্রকল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল, ক্ষতি, ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত ব্যারেজ নিয়ে ১০ প্রশ্ন
প্রস্তাবিত ব্যারেজ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ১০টি প্রশ্ন তুলে ধরেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। এর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পটি নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন; ব্যারেজের মাধ্যমে শুধু বর্ষাকালের পানি শীতকালে ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত; ভাটির এলাকার ওপর ব্যারেজের সম্ভাব্য অভিঘাত নিয়ে আলোচনা কোথায়; গঙ্গার বর্ষাকালের পানি বর্তমানে শাখা নদীগুলোতে পর্যাপ্তভাবে প্রবাহিত হয় না কেন; দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা এবং এর সমাধান নিয়ে প্রকল্পে কী ভাবা হয়েছে।
এ ছাড়া উজানে পলিপতন, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে প্রকল্পের প্রবক্তারা কতটা আশ্বস্ত করতে পারছেন, পাংশার উজানে ব্যারেজের সম্ভাব্য সুফলের হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য এবং ব্যারেজ নির্মাণের ফলে গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হবে কি না—এসব প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পুরোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকল্প প্রণয়ন এবং বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
উজানের অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ
সেমিনারে অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান বলেন, গঙ্গা অববাহিকার মাত্র ৪ শতাংশ এলাকা বাংলাদেশের অংশ হলেও দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ এই অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে উজানে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রভাব ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি পড়ে।
তার মতে, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে অববাহিকাভিত্তিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফারাক্কা ছাড়াও ভারতে অন্তত ৩০০টি অবকাঠামো রয়েছে, যেগুলোর কারণে গঙ্গার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে উজানে আরও অবকাঠামো নির্মাণ হলে এই প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যারেজের পক্ষে-বিপক্ষে মত
সেমিনারে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর জবাব দেন ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এস এম মাহবুবুর রহমান। তিনি বললেন, যথেষ্ট গবেষণা ও পর্যালোচনার পরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। চীন ও ভারতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেও প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে এক লাখের বেশি ব্যারেজ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই অনেক দেশে ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও পদ্মা ও তিস্তায় ব্যারেজ নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশবিদদের আপত্তি থাকলেও ব্যারেজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই ব্যারেজের বিকল্প কী হতে পারে, সেটিও ভাবা প্রয়োজন।
ভূতত্ত্ববিদ ও অধ্যাপক আহাদ চৌধুরী পদ্মা ব্যারেজকে জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রকৌশলগত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকলে বাংলাদেশও পিছিয়ে পড়বে। তবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট না করে এবং নদীকে জীবন্ত রেখে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, এ প্রকল্পের নাম ‘পদ্মা ব্যারেজ’ না হয়ে ‘গঙ্গা ব্যারেজ’ হওয়া উচিত। পদ্মা নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকলেও মূল নদী গঙ্গার নাম বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
সেমিনারে বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, প্রকল্প বিষয়ে আলোচনার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নেই বলে জানানো হয়েছে। বিষয়টি হতাশাজনক।







