আলোর ফাঁদে পকেট কাটা, বাসি পণ্যও তাজা!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাঁচাবাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ে আলোর এক অদ্ভুত খেলা। টকটকে লাল আলোয় জ্বলজ্বল করছে আম, আলু কিংবা আপেল। গাঢ় সবুজ আলোর নিচে থাকা শাকসবজি দেখে মনে হবে এইমাত্র মাঠ থেকে তোলা। আর নীলচে আলোর নিচে সাধারণ মাছও হয়ে উঠছে রুপালি ইলিশের মতো চকচকে। আপাতদৃষ্টিতে একে সাধারণ বিপণন কৌশল মনে হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে নতুন এক প্রতারণা। বাসি, পচা বা নিম্নমানের পণ্যকে তাজা দেখাতে বিক্রেতারা ব্যবহার করছেন রঙবেরঙের হরেক বৈদ্যুতিক বাল্ব। আর এই কৃত্রিম আলোর মায়াজালে পড়ে পণ্যের আসল মান ও রঙ বুঝে উঠতে না পেরে ঠকছেন ক্রেতারা। এ চিত্র রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ নগর-শহরের।
বাজারে ক্রেতাদের চোখ ফাঁকি দিতে সুনির্দিষ্ট পণ্যের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে সুনির্দিষ্ট রঙের আলো। মাছ বাজারে মাছ তাজা ও চকচকে দেখাতে ব্যবহার করা হয় নীল বা সাদা-নীল আলো। এতে অনেক দিনের বাসি মাছও তাজা দেখায় বরফে ঢাকা অবস্থায়। ক্রেতারা সাধারণত মাছের ফুলকা দেখে তাজা কি না তা যাচাই করেন। লাল আলোতে মাছের ফুলকা লাল দেখায় ঢের বেশি ।
সবজি বাজারে শাকসবজি বা কাঁচামরিচ তরতাজা দেখাতে ব্যবহৃত হচ্ছে গাঢ় সবুজ, লাল বা নীল রঙের আলো। আবার ফলের দোকানে ফল পাকা দেখাতে ব্যবহার করা হয় হলুদ, লাল বা কমলা রঙের বাল্ব। এতে করে অপরিপক্ক ফলও হয়ে উঠে লোভনীয়।
আলোর মায়াজালের এই প্রতারণা থেকে বাদ পড়ছে না মসলার বাজারও। আলুর ক্ষেত্রে সাদা আলুর জন্য সাদা এবং লাল আলুর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে লাল আলো। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে লালচে আলো ব্যবহার করে এর ভেতরের আলগা খোসা বা পচা অংশ করা হয় আড়াল।
রাজধানী ঢাকায় নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরার অন্যতেম বড় বাজার কারওয়ান বাজার। সেখানকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, পণ্যের খুঁত ঢাকতেই তারা মূলত বেছে নিয়েছেন আলোর আভার এই কৌশল।
পেঁপে বিক্রেতা সামসুল মিয়া জানালেন, গাড়ি থেকে নামানোর সময় পেঁপের গায়ে পড়ে ছোট-বড় দাগ। সবুজ লাইট জ্বালালে সেই দাগগুলো আর দেখা যায় না। লাইট না লাগালে দাগের কারণে দাগযুক্ত পেঁপে কিনতে চায় না ক্রেতারা।
একই ধরণের তথ্য জানালেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সরুজ আলী। বলছিলেন, বস্তা থেকে বের করার পর পেঁয়াজের মধ্যে থাকে প্রচুর আলগা খোসা। এই রঙের লাইট জ্বালালে খোসাগুলো আলাদা করে আর পড়ে না চোখে। লাইট না থাকলে ক্রেতারা বিরক্ত করে, নিতে চায় না।
পনেরো বছর ধরে আলু বিক্রি করেন মিজান। তিনি জানান, আগে তারা ব্যবহার করতেন সাধারণ লাইট। পরে বাজারে অন্যদের লাল লাইট জ্বালিয়ে ভালো বিক্রি করতে দেখে তিনিও সাদা আলুর জন্য সাদা আর লাল আলুর জন্য শুরু করেন লাল লাইট লাগানো। এখন বাজারের সবাই ধরেছেন এই পথ।
ঘরে ফিরলেই ভুল ভাঙছে ক্রেতাদের: বাজারের এই আলোর ফাঁদে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাজারে এক রঙ দেখে পণ্য কিনে বাসায় গিয়ে তারা দেখছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ। অনেক ক্রেতা আবার বুঝতেই পারেন না কেন এই রঙিন আলো জ্বালানো হয়েছে।
আলু কিনতে আসা আমিরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘ভিন্ন কালারের লাইট কেন ব্যবহার করা হয়, তা কোনোদিন ভেবে দেখিনি। মনে হয়েছে আলো কম থাকায় লাইট জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু লাইটগুলো যে ভিন্ন রঙের, তা ভালোভাবে খেয়ালই করিনি।’
বাজার করতে আসা শান্ত মিয়া একরাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘বাজারে দেখি একরকম, কিন্তু বাড়িতে আনার পর দেখি আরেকরকম। বেশি ঝামেলা হয় মাছের ক্ষেত্রে। বাজারে ফুলকার রঙ লাল দেখালেও বাসায় আনার পর দেখা যায় সেটা কালচে। কেনার সময় তাজা মনে হলেও বাসায় আনার পর বুঝি মাছটা বাসি। পরবর্তীতে এগুলো আর ফেরত দেওয়া যায় না। বাজারে শুধুমাত্র সাদা লাইট ব্যবহারের নিয়ম করে দেওয়া উচিত।’
বাজারের এই প্রকাশ্য প্রতারণা রোধে পদক্ষেপ কী জানতে আগামীর সময় যোগাযোগ করে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডলের সঙ্গে। কিন্তু তিনি মুখে আটলেন কুলুপ। দিলেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ। পরবর্তীতে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি পাওয়া যায় বন্ধ।
ক্রেতাদের দাবি, বাজারগুলোতে রঙিন আলোর এই ফাঁদ বন্ধে দ্রুতই শুরু করতে হবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। তা না হলে সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা দিয়ে বাসি ও নিম্নমানের পণ্য কেনার এমন প্রতারণা চলতেই থাকবে।




