১৫ বছর পর চাকরিতে ফেরা কে এই ডিসি কোহিনূর

সংগৃহীত ছবি
১৫ বছর পর চাকরি ফিরে পেয়েছেন বহুল আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মো. কোহিনূর মিয়া। দেড় দশক ছিলেন আড়ালে। তাকে নিয়ে ছিল না কোনো আলোচনা। তবে চাকরি ফিরে পেয়ে আবারও আলোচনায় ডিসি কোহিনূর।
সোমবার (৯ মার্চ) রাষ্ট্রপতির পুনর্বিবেচনার আওতায় প্রায় ১৫ বছর আগের বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে তাকে সরকারি চাকরিতে পুনর্বহাল করেছে সরকার। নতুন আদেশের ফলে তিনি পুলিশে চাকরি ফিরে পেলেন।
এই পুলিশ কর্মকর্তার বরখাস্তকালীন সময়কে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করে তাকে প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে।
মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করেছেন। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।
কে এই কোহিনূর মিয়া
বিসিএস ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়া। তার বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায়। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন সরকারের আস্থাভাজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন কোহিনূর। তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মামলা-অভিযোগ থাকায় কোণঠাসা করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। একপর্যায়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
২০০২ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলকাণ্ডে প্রথম উঠে আসে কোহিনূর মিয়ার নাম। ওই বছরের ২৩ জুলাই গভীর রাতে শামসুন্নাহার হলে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর হলের ফটক ভেঙে হামলা চালায় পুলিশ। তখন ওই হামলার নেপথ্যে এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম আলোচিত হয়।
২০০৬ সালের ১২ মার্চ ধানমন্ডির রাপা প্লাজার সামনে শাহিন সুলতানা শান্তা নামের এক নারী পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সেদিন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ ও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
ওই সময় নিজের ছেলেকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে শান্তা ভয়ে পাশের একটি ক্লিনিকে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সদস্যরা তাকে ও তার ছেলেকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলেন এবং মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর ২০০৬ সালের ১৪ মার্চ শান্তা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার কোহিনূর মিয়া ও এক কনস্টেবলের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেয়। এতে আপত্তি জানিয়ে শান্তা বিচার বিভাগীয় তদন্তের আবেদন করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০০৯ সালে মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন আদালত।
২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবশেষে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার বরখাস্তের আদেশ বাতিল করা হয়।
তবে মামলার অভিযোগপত্র জমা দিতে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় লাগে এবং ২০২৩ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সম্প্রতি তিনজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিলেও তারা ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। এরপরই আদালত কোহিনূরসহ তিনজনকে খালাস দেন।
২০০৪ সালের ৫ মে পৌরসভা নির্বাচনের সময় ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুজন ও আবু তাহের নামে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় শুরুতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও তদন্তে আসামি শনাক্ত না হওয়ায় একাধিকবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
পরে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া ওই ঘটনায় সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরী, ময়মনসিংহের তৎকালীন পুলিশ সুপার কোহিনূর মিয়া ও পৌর মেয়র আবদুস ছাত্তার ভূঁইয়া উজ্জ্বলসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা করেন।
পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ২০১১ সালে কোহিনূর মিয়া ও উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেন।

