ফ্যাসিবাদ রুখতে জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—ফাইল ছবি
স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঠেকাতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়কার জাতীয় ঐক্য অটুট থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনীতে এ কথা জানান তিনি।
অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘জাতীয় সংসদ এবং সংসদের রীতি অনুযায়ী সারা বিশ্বে যেটি প্র্যাকটিস— সেই অনুযায়ী অবশ্যই আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে, তবে অবশ্যই শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের পরিবর্তে থাকবে ন্যায়পরানতা। যা বিরোধীদলীয় নেতা জোর দিয়েছেন, আমিও একই সঙ্গে তার উপরেই জোর দিতে চাই—এই বাংলাদেশে আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, আর যাতে আমাদের মাতৃভূমি তাবেদারী রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। এই প্রশ্নে আমরা অর্থাৎ সংসদে বিরোধী দল এবং সরকারি দল— দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের মধ্যে রয়েছে জাতীয় ঐক্য এবং যেকোনো মূল্যে এই ঐক্য অটুট এবং বজায় থাকবে ইনশাআল্লাহ।’
রাষ্ট্র ও সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সরকারপ্রধান। দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলছিলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের সরকার, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করি, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই— যেখানে রাষ্ট্র এবং সরকার হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বোপরি নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনো প্রকার চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দিবে না। বিশ্বাস করি, এ ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী দলের সহযোগিতা পাব ইনশাআল্লাহ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, স্বৈরাচারের সময় প্রতিবছর দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করে দেওয়া হয়েছে। এই দুর্নীতিকে হাত বেঁধেই হোক, টুঁটি চেপে হোক, যেকোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
দুর্নীতি দমন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বললেন, ‘বর্তমান সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। সেটিরই অংশ হিসেবে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে জনগণের জন্য জীবনবান্ধব বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। এর সুফল জনগণের দৌরগড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারি প্রশাসন কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি কর্তৃপক্ষ সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলছিলেন, ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি আমরা গড়ে তুলতে চাই। আমাদের সরকারের মূল যে কয়টি পরিকল্পনা— তার অন্যতমই হচ্ছে, ঋণনির্ভর থেকে অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর করা। আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব, সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। সেই কারণেই বর্তমান সরকার সকল পরিকল্পনা এমনভাবে তৈরি করেছে— যাতে ইনশাআল্লাহ ২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির কাছাকাছি যেতে পারি।
একটি বিশেষ দেশকে সুবিধা দিতে বিগত সরকার পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে ধবংস করেছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি জানালেন, বর্তমান সরকার এই দুই খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্ধ করবে।
সমগ্র বিশ্ব একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতেও আমরা অর্থনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছি। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়ন করব।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বললেন, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি শব্দ ও অক্ষর আমাদের সরকার বাস্তবায়ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে আমাদের যে ৩১ দফা রয়েছে, যাকে জনগণের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তা এখন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার।
এর আগে দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী অধিবেশনের প্রথম ত্রিশ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নকাল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ছিল ৭টি তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন। এরমধ্যে নির্ধারিত ত্রিশ মিনিটে তিনটি তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন ও এ সংক্রান্ত সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদের তারকাচিহ্নিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন, খেলার মাঠ দখলমুক্ত এবং ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের খেলাধুলার মান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে শিশুরা খেলার মাঠে খেলাধুলা করতে পারছে। ইতোমধ্যে ঢাকার অধিকাংশ পার্ক ও মাঠ উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে দখলমুক্ত করা হয়েছে এবং আধুনিকায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পিরোজপুর-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রুহুল আমীন দুলালের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, দেশ স্বাধীনের পরে প্রকৃত শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা প্রণয়ন যাদের দায়িত্ব ছিল— তারা সেটাকে রাজনীতিকরণ করেছে। তারা সেটা নিরপেক্ষভাবে-সঠিকভাবে করেনি। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি নতুন করে গঠন করেছে। যেখানে আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, প্রকৃত শহীদদের চিহ্নিত করা জন্য চেষ্টা করব।
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কাজে জড়িত দুর্নীতিবাজদের ছাড় নেই। কোনো কাজে দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে আইন অনুযায়ী দোষীদের অবশ্যই বিচার করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর রাষ্ট্রের ও জনগণের সম্পদ; তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদের যেকোনো অপচয় রোধ এবং দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।’







