খেয়ালখুশিমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে সাফারি পার্ক প্রকল্প!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খেয়ালখুশিমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে গাজীপুর সাফারি পার্ক উন্নয়ন প্রকল্প। কেনাকাটায় নেই কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা। সেই সঙ্গে মানা হচ্ছে না পরিকল্পনাসংক্রান্ত নির্দেশনাও। একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন একজন প্রকল্প পরিচালক (পিডি)। এরকম নানা অনিয়মের ঘটনা উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন পরিদর্শনে। গত ৩০ জুন পরিদর্শন প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে।
এ বিষয়ে আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনকারী পরিচালক মুহাম্মদ কামাল হোসেন তালুকদার আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি অল্প সময়ের জন্য পরিদর্শন করেছি। এতেই নানা অসংগতি উঠে এসেছে। সরকারি অর্থে এভাবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় না। এটি আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলার পরিপন্থী। করণীয় বিষয়ে আমরা সুপারিশ করেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা।’
সূত্র বলছে, ‘গাজীপুর সাফারি পার্ক, গাজীপুরের অত্যাবশকীয় ব্যবস্থাপনা সহায়ক’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এতে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২০ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। তবে এ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৪০ শতাংশ।
প্রতিবেদন পর্যালোচনায় বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। ডিপিপির (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ক্রয় পরিকল্পনায় ১৮টি পণ্য এবং ২৭টি কার্য প্যাকেজের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে পরিদর্শনের সময় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। একই ধরনের কাজ বারবার ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ১০ থেকে ১৮ নম্বর পণ্য প্যাকেজে প্রাণীর টিকা ও ওষুধ কেনার কাজকে প্রয়োজন ছাড়াই একাধিক ছোট প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের প্যাকেজ বিভাজনকে সরকারি ক্রয় বিধিমালাবহির্ভূত বলা হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বেশ কয়েকটি অনিয়মের কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) প্রণয়ন করতে হয়। এ পরিকল্পনায় ক্রয়কারী কার্যালয়ের প্রধানের অনুমোদনও বাধ্যতামূলক। তবে প্রকল্প পরিদর্শনের সময় এমন কোনো অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। একই ধরনের কাজকে বারবার ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য তিনটি (৮, ৯ ও ১০) এবং কম্পিউটার ও সরঞ্জাম মেরামত-সংরক্ষণের জন্য তিনটি (৬, ৭ ও ৮) আলাদা প্যাকেজ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা প্রতি তিন মাস অন্তর করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকল্প শুরু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি পিআইসি এবং দুটি পিএসসি সভা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘আগের প্রকল্প পরিচালকদের সময় যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোর দায় আমার নয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো অনিয়ম করিনি। সরকারি ক্রয় আইন মেনেই সব কেনাকাটা করা হয়েছে।’
জলাধার খননের কাজ কোটেশনের মাধ্যমে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘অর্থ ছাড় কম হওয়ায় এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।’
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণসংক্রান্ত পরিপত্র অনুসরণ করা হয়নি। এর আগে দুইজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বারবার প্রকল্প পরিচালক বদল হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম প্রতিবন্ধক।
প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন আগারগাঁও বন ভবনের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্লাহ পাটোয়ারী। তিনি একই সময়ে সাতটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। দ্বিতীয় প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ঢাকার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তার। তিনিও একই সঙ্গে তিনটি প্রকল্প পরিচালনা করছিলেন। বর্তমানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিপিপির ৩৭ নম্বর কার্য প্যাকেজে তৃণভোজী প্রাণীর বেষ্টনীতে জলাধার খননের কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫০ লাখ টাকা। বিধি অনুযায়ী কাজটি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোটেশনের মাধ্যমে ৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকার আংশিক চুক্তি করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, এটি সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০২৫-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ কারণে প্রকল্পটির ক্রয়সহ আগের সব ক্রয় কার্যক্রম যাচাই করার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে আইএমইডি। পাশাপাশি প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকিরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর পিআইসি ও পিএসসি সভা আয়োজনের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অনিয়মের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে আইএমইডিকে জানাতে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।






