প্রশ্নের প্ল্যাটফর্মে রেলের ইঞ্জিন
- ইঞ্জিন কিনতে চায় রেল কর্তারা, ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন পিইসির
- মোট খরচ হবে ২,৮২৭ কোটি টাকা
- সরকারি তহবিলের ৮২৮ কোটি
- বৈদেশিক ঋণ ১,৯৯৯ কোটি টাকা
- পরামর্শক ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন
- সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগে ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কিনতে চাইছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে, যা নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিইসি সভায় থাকা এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, প্রতিটি ইঞ্জিনের ব্যয় (সিডি-ভ্যাটসহ) প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। প্রস্তাবিত ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি এবং অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় কেনা ইঞ্জিনের ব্যয় প্রাক্কলনের সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা দরকার। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে তাদের কাছে। এ ছাড়া প্রকল্প শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছরের জন্য স্পেয়ার পার্টস বাবদ ৪৬৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সভায় এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও তোলা হয়েছে প্রশ্ন।
এই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, স্পেয়ার পার্টসের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি, নির্ভরযোগ্য বাজারদর, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির প্রকাশিত দর, অন্যান্য প্রকল্পের তুলনামূলক দরের আলোকে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী স্পেয়ার পার্টসের নাম, সংখ্যা, পরিমাণ ও একক দরও প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। পরামর্শ সেবা বাবদ ২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতা জানতে চাওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের প্রস্তাবে ৩০টি ইঞ্জিন পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুজন সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ খাতে ৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়েও সভায় প্রশ্ন উঠেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া টেস্টিং ফি বাবদ ৭৫ লাখ, ট্রান্সপোর্ট ফি ৭৫ লাখ, ব্যাংক চার্জ ৫৫ কোটি, পোর্ট চার্জ দেড় কোটি, ভ্রমণ ব্যয় ২০ লাখ, জরিপে ৭৫ লাখ টাকার ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে পিইসি সভায়।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, রেলওয়ের ইঞ্জিন কেনার প্রস্তাবটি সংশোধনের জন্য শিগগিরই রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হবে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রেলওয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন ইঞ্জিন কিনতে ঋণ দেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। এতে খরচ ধরা হয়েছে, ২ হাজার ৮২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৮২৭ কোটি ৯৩ লাখ আর বিদেশি ঋণ থেকে ১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, প্রকল্পের প্রক্রিয়াকরণ শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তিনি আরও জানিয়েছেন, পুরনো এবং জরাজীর্ণ ইঞ্জিনগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক ইঞ্জিন, প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রাংশ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অর্জন বা জ্ঞান স্থানান্তর, ট্রেন পরিষেবার জন্য আধুনিক, নিরাপদ এবং উন্নতমানের ইঞ্জিন সরবরাহ এবং যাত্রীসাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সূত্র জানিয়েছে, রেলওয়ের বর্তমান লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) সংখ্যা ২৯৬টি (১৬৮টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ)। মেকানিক্যাল কোড এবং ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। কিন্তু রেলওয়ে ১১৮টি (৭০ শতাংশ) মিটারগেজ ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।
রেলওয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এসব পুরনো ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল এবং নির্ভরযোগ্যতা কম। বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে সুষ্ঠু ট্রেন পরিচালনা বাড়ানো এবং দ্রুত বর্ধনশীল মালবাহী ও আন্তঃনগর যাত্রীবাহী ট্রাফিকের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইঞ্জিন বহরের স্বল্পতার কারণে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। একই সঙ্গে এগুলোর পারফরম্যান্স বিবেচনায় ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভগুলো ৩০ বছর পরিষেবা দেওয়ার পর প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। এ বিবেচনায় ৩০ বছরের বেশি আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ এমন ৭৯টি এমজি লোকোমোটিভ (মোট এমজি লোকোমোটিভের ৪৮ শতাংশ) দ্রুত প্রতিস্থাপন করা দরকার। কারণ, এসব ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ বেশ কঠিন এবং খুবই ব্যয়বহুল।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সরকারি খাতে বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের কারণে পুরনো ইঞ্জিনগুলো প্রতিস্থাপন করা কঠিন। বাংলাদেশ রেলওয়ে গত পাঁচ বছরে ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে এডিবির ঋণের বিপরীতে ১০টি এবং কোরিয়ার ইডিসিএফ ঋণের বিপরীতে ২০টি কিনেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ২০৪৫ সালের মধ্যে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দেশ রেলওয়েকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ২০৫৫-৬০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়েকে মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করতে হবে।




