ঈদযাত্রা
নদী-রেল-সড়কপথ—দুঃখ ছিল সবখানেই

সংঘর্ষের পর বাসটিকে হিঁচড়ে আধা কিলোমিটার দূর পর্যন্ত নিয়ে যায় ট্রেনটি
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নির্বাহী আদেশে ছুটি বাড়িয়ে দিয়েছিল সরকার। রাজধানীর সদরঘাটের পাশাপাশি বসিলায় পুরোনো বুড়িগঙ্গায় তৈরি করা হয়েছিল অস্থায়ী টার্মিনাল। উদ্দেশ্য ছিল যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো এবং ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করা। সরকারের প্রস্তুতির কথা শোনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন এবারের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে। কিন্তু সড়ক, রেল ও নৌপথে একের পর এক দুর্ঘটনায় ম্লান হয়ে গেছে ঈদের আনন্দ।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট মহল আদেশ জারি করে দায়িত্ব সেরে ফেললেও, তা বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে প্রতিটি দুর্ঘটনার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
গত ১৮ মার্চ বিকেলে সদরঘাটে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও বাবাকে সঙ্গে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে নদীতে থাকা লঞ্চে উঠতে যাচ্ছিলেন মো. সোহেল। এ সময় ঢাকা-ইলিশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ এবং ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ লঞ্চের মাঝখানে চাপা পড়ে তাদের নৌকাটি। এতে প্রাণ হারান সোহেল।
এই দুর্ঘটনার চিত্র দেখে যে কারও বুক কেঁপে উঠবে। অথচ সঠিক নজরদারি থাকলে লঞ্চের মাঝে ট্রলার ঢুকতেই পারত না।
ঈদের দিন ২১ মার্চ সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদে। ওই দিন ড্রাম ব্রিজ নদীতে ভেঙে পড়ে নিহত হয় চার শিশুসহ পাঁচজন।
জানা যায়, প্রতি বছরই ঈদ উপলক্ষে ওই ব্রিজে আশপাশে মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়। এবারো ঈদের দিন বিকালে সেখানে প্রচুর মানুষ আসেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। আজ অতিরিক্ত চাপের কারণে হঠাৎ সেটি ভেঙে পড়ে।
এছাড়া গত ২২ মার্চ কুমিল্লায় একটি রেলক্রসিংয়ে বাস ও ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এই অব্যবস্থাপনারই আরেকটি উদাহরণ।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই গেটম্যান হেলাল ও মেহেদীর দায়িত্বহীনতার কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দুজনকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া এ ঘটনায় মোট তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এ ঘটনায় গত সোমবার কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে থানায় মামলা করেন শেফালী আক্তার (৫৮) নামে এক নারী। তিনি ওই দুর্ঘটনায় নিহত এক যাত্রীর খালা।
এরপর দিন ২৩ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পরিবারের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল চার বছর বয়সি শিশু সেহেরিশ। পথে তাদের বহনকারী প্রাইভেটকারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে থাকা গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে সেহেরিশসহ নিহত হন তার বাবা ও দাদু। এ ঘটনায় গুরুতন আহত হন প্রাইভেটকারে থাকা ওই পরিবারের আরও তিনজন।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল বুধবার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ৪০ জন যাত্রীসহ একটি বাস পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা শুধু এবারের ঈদেই নয়, আগেও বহুবার ঘটেছে। কিন্তু বারবার প্রাণহানির পরও সরকারি তৎপরতা বাড়েনি। দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই উৎসব করতে গিয়ে কিংবা কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে নিরীহ মানুষ সপরিবারে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

