শনিবারের মধ্যে গ্যাস দুর্যোগের উন্নতির আশা
- পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে লাগবে আরও কিছুদিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তীব্র গ্যাস সংকটে ওলটপালট জনজীবন। তবে আগামী শনিবারের মধ্যে চলমান দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা। যদিও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে লাগবে আরও কিছুদিন।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, বেড়েছে লোডশেডিংও।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে গত মঙ্গলবার একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রাংশের ক্ষতি হওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অন্য একটি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গ্যাসসংকট প্রকট আকার নিয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৮০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় কমবেশি ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকে সরবরাহ ৫০ কোটি ঘনফুটে নেমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২১৫ কোটি ঘনফুটের মতো। এর ফলে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র সিএনজি স্টেশনসহ সব খাতে ভয়াবহ গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে।
টার্মিনালে ওই দুর্ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসে গত বৃহস্পতিবার থেকে মেরামত কাজ শুরু করেছেন।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, কিছু যন্ত্রপাতি এরই মধ্যে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। এখন সেখানে দ্রুতগতিতে মেরামত কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী শনিবারের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দুটি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে একটি পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি, যার সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট। ৫০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার অন্য টার্মিনালটি পরিচালনা করছে বেসরকারি কোম্পানি সামিট গ্রুপ। মূলত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করতে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে মার্কিন কোম্পানিটি। তার আগে আগামী সপ্তাহে আংশিক মেরামত শেষে ৩০-৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।
তবে জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, এখন পর্যন্ত কাজের যে অগ্রগতি তাতে এক্সিলারেট যে সময় নিয়েছে তার আগেই পুরো মেরামত কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
গ্যাসসংকট নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলছিলেন, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার। খুব শিগগির ত্রুটি সেরে ফেলা হবে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংকট কিছুটা কমে আসবে। পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
গ্যাসের অভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে এলপিজি সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করে বাড়তি ব্যয়ে কোনোমতে রান্না করছেন। কেউবা ব্যবহার করছেন লাকড়ির চুলা। আবার কেউ কেউ রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।
শিল্পকারখানাতেও বড় সংকট দেখা দিয়েছে। সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ যানবাহনের লাইন দেখা যাচ্ছে কয়েক দিন ধরে। সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকের আয় কমে গেছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাবে বিদ্যুতের উৎপাদনও কমে গেছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। গত রবিবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৮৩ মেগাওয়াট। সেখানে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৪৮৫ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে। ওইদিন লোডশেডিং দেড় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। গতকালও লোডশেডিং ছিল।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদামতো বিদ্যুৎ কখনই উৎপাদন করা যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও এখন তা ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কম। সেখান থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হয়। কিন্তু তাতে ব্যয় অনেক বেশি। এ কারণে লোডশেডিং বেড়েছে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে মূলত গ্যাসসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ব্যাপকহারে বৃদ্ধির পাশাপাশি জরুরি সংকট সমাধানে আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে। পাশাপাশি আমাদের অন্তত দুই সপ্তাহের এলএনজি মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলা দরকার আপৎকালীন সময়ের জন্য। এ সবকিছু নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ডলারের ওপর।’
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, কেবল এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দেশের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার কারণে আমদানিনির্ভরতা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তাই নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি, অফশোর অনুসন্ধান দ্রুত সম্পন্ন করা এবং জ্বালানির বহুমুখীকরণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।




