আগস্টে রাজনৈতিক ও মব সহিংসতায় নিহত ৩৫, আহত ৫৩৬
- ১২ জন গুলিবিদ্ধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে আগস্ট মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল, মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক হয়রানি, সীমান্তে হত্যা এবং শ্রমিক নির্যাতনের মতো ঘটনায় পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৭০ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন। একই সময়ে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৫৩ ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৮ জনের।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর আগস্ট মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনটি দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাইয়ে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হয়েছিলেন। আগস্টে ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০টিতে। এতে নিহত ৭ এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই নিহত ৫
আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতার বড় অংশ ঘটেছে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১৫২ জন।
বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ১৮ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ জন এবং আহত হয়েছেন ২৩৩ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ১ জন ও আহত হয়েছেন ২৬ জন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬ জন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
এ ছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে আরও ৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭১ জন। নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন এবং জামায়াতের ১ জন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতাও ছিল উদ্বেগজনক। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে অন্তত ১৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ২১৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে ৮টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৮১ জন। ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩৫ জন।
এইচআরএসএস বলছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় কোন্দল, হামলা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন জেলায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
১২ জন গুলিবিদ্ধ
রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ১৯টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় নির্বাচনী বিরোধে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।
আগস্টে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৬২টির বেশি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। এসব মামলায় ১ হাজার ১২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও প্রায় ২ হাজার ২০৯ জনকে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মাসজুড়ে মোট ১৬২টি ঘটনায় ১২ হাজার ৮২৩ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থি সংগঠনের ৫ সদস্য রয়েছেন।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতাকে আগস্টের অন্যতম উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এইচআরএসএস। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে অন্তত ৫৩টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২ জন।
নির্যাতনের শিকার ৪৫ সাংবাদিক
আগস্টে অন্তত ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন আহত, ৬ জন লাঞ্ছিত এবং ৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। আটক করা হয়েছে ৫ সাংবাদিককে।
সংবাদ প্রকাশের জেরে একটি মামলায় একজন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর আওতায় করা একটি মামলায়ও একজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। আগস্টে ১৩টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৬১ জন আহত এবং ৮ জন আটক হয়েছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ৮টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক এবং ৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে অন্তত ১১ জনকে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় পৃথক ৪টি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত ও আটক করার তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস।
কারাগারে ৬ মৃত্যু
আগস্টে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৬ আসামির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন কয়েদি এবং ৫ জন হাজতি। মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন এবং পাঁচজন সাধারণ আসামি ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদী-খাল ও পরিত্যক্ত স্থানে ৮৭ লাশ
আগস্টে দেশের নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৮২টি ঘটনায় ৮৭টি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। এর মধ্যে ১২টি লাশ ছিল বস্তাবন্দি অবস্থায়। ১৭টি ঝুলন্ত অবস্থায় এবং ২৬টি শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গলা কাটা অবস্থায় ৯টি এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ৮টি লাশ পাওয়া গেছে। অন্যান্য পরিস্থিতিতে আরও ১৫টি লাশ উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।
সীমান্তেও উদ্বেগ
আগস্টে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলার ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে ৫ জনকে। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং আরও ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি যুবক নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। জলসীমা থেকে আটক করা হয়েছে ৩ জনকে।
আগস্টে শ্রমিক নির্যাতনের অন্তত ৮৪টি ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আরও অন্তত ৬৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পৃথক দুটি ঘটনায় দুই গৃহকর্মীর মৃত্যু এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
আগস্টে অন্তত ২৪৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৯ জন ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের শিকারদের ৪৬ জনই, অর্থাৎ ৫৮ শতাংশ, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৮ নারী ও কন্যাশিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার ৯৩ জন, যাদের মধ্যে ৩৮ শিশু। যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ৬ নারী নিহত, ৭ জন আহত এবং একজন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪৯ নারী। আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন।
এদিকে আগস্টে মোট ২৮২ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২০৫ শিশু।
‘পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে’
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, আগস্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সামগ্রিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক ও ক্যাম্পাস সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে।
বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
মানবাধিকার রক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও আরও সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।





