হবে ১৩ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকার গঠনের প্রায় চার মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে বের হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া এবং চীন— এ দুই দেশে ছয় দিন ব্যস্ত সময় পার করবেন তিনি। আগামী রবিবার বেলা পৌনে ৩টায় বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সোমবার দিনভর সেখানে ব্যস্ত সময় পার করে ওইদিনই দেবেন চীনে রওনা। বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এই দুটি দেশ সফরে স্বাক্ষর হতে পারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। এর মধ্যে কুয়ালালামপুরে সাংস্কৃতিক ও সন্ত্রাস দমনসংক্রান্ত সহযোগিতা নিশ্চিতে তিনটি এবং বেইজিংয়ে ১০টি এমওইউ স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। বেইজিংয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প পার্ক, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অর্থায়ন। এসবের বাইরেও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে, অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে চীনে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে— এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এ সফরের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের আশা করছি।’
জানা গেছে, মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিন ২২ জুন দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি শুরু হবে। গার্ড অব অনার, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং ফটোসেশনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সীমিত পরিসরের বৈঠক হবে। পরে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে দুদেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আলোচনায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, মালয়েশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পাবে। বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে তিনটি সমঝোতা স্মারক এবং একটি নোট বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা এবং সন্ত্রাস দমনসংক্রান্ত সহযোগিতা নিশ্চিতে এমওইউ হওয়ার কথা জানা গেছে। বৈঠকের পর দুদেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সফরের ফল তুলে ধরবেন।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের জন্যও পৃথক কর্মসূচি রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার পর তিনি মালয়েশিয়ার ফার্স্ট লেডির সঙ্গে একটি ক্যানসার হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন। সেখানে ক্যানসার চিকিৎসা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতবিনিময় হবে। পরে তিনি আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। মধ্যাহ্নভোজে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকবে। বাংলাদেশি শিল্পীরা পরিবেশন করবেন ‘বলতে বলতে চলতে চলতে’, ‘যে দেশে রামধনু আঁকে’ এবং ‘প্রথম বাংলাদেশ’ গান।
জানা গেছে, বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট বৈঠকও নির্ধারিত রয়েছে। এমএমসি পোর্টসের সঙ্গে বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে সহযোগিতা, এয়ার এশিয়ার সঙ্গে বিমান চলাচল ও পর্যটন খাত এবং পেট্রোনাসের সঙ্গে জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বন্দর, বিমান পরিবহন এবং জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে।
৪ দিনের সফর চীনে: জানা গেছে, ২২ জুন বিকালে মালয়েশিয়া সফর শেষে সরাসরি চীনের একটি উপকূলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৩ জুন দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে জলবায়ু এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি। ২৪ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিশ্ব অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ, সবুজ অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু প্রাধান্য পাবে। একই দিনে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে।
২৫ জুন বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফোরামে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এতে শতাধিক বিনিয়োগকারী ও শিল্পপতির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ সময় চেরি গ্রুপ, হান্ডা গ্রুপ এবং চায়নাটেক্স করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হবে। এসব অটোমোবাইল, শিল্প বিনিয়োগ এবং বস্ত্র খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই দিন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। বৈঠক শেষে প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প পার্ক, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অর্থায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো এসব সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে। সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে ২৬ জুন। ওইদিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশে চলমান ও সম্ভাব্য অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন এবং অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা, চীনা শিল্পকারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের সম্ভাবনা, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়েও দুই নেতার মধ্যে মতবিনিময় হতে পারে।
সফরসূচি অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে দুদেশ সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা।
কূটনৈতিক মহলের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।




