বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জে ‘হাত দেওয়ার অবস্থা নেই’ : বিদ্যুৎমন্ত্রী
- বসে থাকা কেন্দ্রের জন্যও টাকা গুনতে হচ্ছে

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও মাস শেষে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। আগের চুক্তির জটিলতায় এ নিয়ে এখন কার্যকর কিছু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ।
আজ মঙ্গলবার বুয়েটে তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) ও বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইইএসডি) যৌথভাবে দ্বিতীয়বারের মতো এ ফেস্টের আয়োজন করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
গত জুনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেওয়া বিপিডিবির প্রস্তাব ও বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটির তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বাল্ক বা পাইকারি সরবরাহ করতে প্রতি ইউনিটে ভর্তুকি ছাড়া ব্যয় হয় ১৩ টাকা ৯ পয়সা। যেখানে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ১২ পয়সা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে বিপিডিবি। অর্থাৎ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুৎ পাইকারি পর্যায়ে বিক্রিতে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে সংস্থাটি। এ-বিষয়ক চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কোম্পানিগুলোকে দিতে বাধ্য থাকে। মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং পরিচালনার খরচ মেটাতেই এ চার্জ দেওয়া হয়।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি বিদ্যুৎ মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ক্রয়ের প্রাক্কলন রয়েছে বিপিডিবির। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ ক্রয়ে মোট ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ চার্জের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু দেখেছেন, এতে হাত দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। ‘হাত দিলেই ব্যাংক চলে আসবে,’ বলেন তিনি। খুলনার রূপসায় নতুন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও জ্বালানি দেওয়া যায়নি, অথচ মাস শেষে টাকা দিতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও তোলেন মন্ত্রী। বলেন, দেশে বছরে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো লাগে, যার ১০০টি আসত কাতার থেকে। জি-টু-জি ভিত্তিতে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে এলএনজি মিললেও কাতারে হামলার পর হঠাৎ ফোর্স মেজিওর ঘোষণা করা হয়।
‘এর ফলে আমাদের স্পট মার্কেটে দৌড়াতে হলো,’ যোগ করেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, যে গ্যাসের দাম ১২ ডলার, তা ৩০ ডলার পর্যন্ত দিয়ে কিনতে হয়েছে। এই পুরো ব্যয় জনগণের ওপর চাপানো সম্ভব নয় বলে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিকল্প উৎস খুঁজতে তিনি গতকালই আলজেরিয়া থেকে ফিরেছেন, সেখান থেকে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই চলছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পুরোপুরি সন্তোষজনক, এমনটি বলব না।’ গ্রামে ফল্ট খুঁজে বের করতেই দুই-তিন ঘণ্টা লেগে যায় বলেও তিনি জানান, যে কারণে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ ওঠে।
বর্তমান সংকটের জন্য বিগত সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন মন্ত্রী। তার দাবি, গত ১৭ বছরে এ খাতে নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় মানুষকে আরও ৫০ থেকে ৬০ বছর বহন করতে হবে। তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মহাপরিকল্পনায় ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরকারি খাতে ও ৩৫ শতাংশ বেসরকারি খাতে উৎপাদনের কথা ছিল। দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য সেটি উল্টে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি খাতে উৎপাদন মাত্র ৩০ শতাংশ।
উল্লেখ্য, দেশে বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের পর থেকে একের পর এক আইপিপি, রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। সময়ের ব্যবধানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে থাকলেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো যায়নি। এতে বছরের পর বছর বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় বিপিডিবিকে। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বিপিডিবির প্রতি ইউনিটে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা (গড়)। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইউনিটপ্রতি এ ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ৫ টাকা ২৪ পয়সায় গিয়ে দাঁড়ায়। ১৪ বছরের ব্যবধানে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ ইউনিটপ্রতি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বিইআরসির কারিগরি কমিটি বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ গত বছরের চেয়ে কিছুটা কমার প্রাক্কলন করলেও আগামী অর্থবছরে পুনরায় এ চার্জ বাড়বে।
গ্যাস অনুসন্ধান নিয়েও একই অভিযোগ করে মন্ত্রী বলেন, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ১৭ বছরে নতুন কূপ খননে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আছে বলে জানান মন্ত্রী। এ লক্ষ্যে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে এবং সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম শুল্কমুক্ত করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য একটি বিশেষ আইন পরবর্তী সংসদে উত্থাপন করা হবে। অতীতে বিশেষ আইনের অপব্যবহার নিয়ে সমালোচনা থাকলেও খাতটির প্রয়োজনে নতুন আইনে 'বিশেষ' শব্দটি রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সঞ্চালন ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের গ্রিড এখনো আধুনিক নয়। পারমাণবিক, জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ একসঙ্গে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি পিজিসিবির নেই।
বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থনীতিতে চাপ পড়ছে, এ অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির জানান, দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, যার বড় অংশ আমদানি করতে হয়। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই নতুন গবেষণা ও বিকল্প উৎসের ব্যবহার বাড়ানো দরকার।
এই আয়োজনে সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর), গ্রিনারি এনার্জি সল্যুশন লিমিটেড, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ), অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও দ্য আর্থ সোসাইটি।





