৭ বছরে সড়কে প্রাণ গেছে ৮ হাজার শিশুর
- নিহতদের ৩৪ শতাংশই গ্রামীণ সড়কে
- মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৫৮ শিশু

ছবি: এআই
সড়কে বেরিয়ে আর ঘরে ফেরা হয়নি হাজারো শিশুর। কেউ মারা গেছে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, কেউ বাড়ির পাশের সড়কে খেলতে গিয়ে। আবার কেউ প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী হিসেবে। গত প্রায় সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। তাদের মধ্যে ৩৭ শতাংশের বেশি মারা গেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। আর সড়ক পারাপার ও রাস্তায় হাঁটার সময় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ১৯৩ জন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ছিল। পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু। আর মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ শিশু। অর্থাৎ নিহত শিশুদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।
শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে সড়কের ধরন বিশ্লেষণে। সবচেয়ে বেশি শিশু মারা গেছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে মারা গেছে ২ হাজার ৮২ শিশু এবং মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ শিশু। শহরের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ১৯৪ শিশু।
পথচারী শিশুদের বড় ঝুঁকি থ্রি-হুইলার
প্রতিবেদনে পথচারী হিসেবে নিহত শিশুদের দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অন্যান্য অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটির মতো যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ২৭১ শিশু। ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ১২৬ শিশু। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ শিশু এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে।
শিশু মৃত্যুর সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে বিকালে। এ সময় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৪ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সকালে মারা গেছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু। সন্ধ্যা, রাত ও ভোরে যথাক্রমে ৫৪৬, ৫৯৮ ও ২০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্কুলে যাওয়া-আসার পথেও প্রাণহানি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৫১৩ শিশু। মোট নিহতের ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশই এই শ্রেণির। অন্যদিকে, বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩২ জনের বয়স ছিল পাঁচ বছর বা তার কম। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ কিশোর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দেশের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না থাকা এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের কারণে শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
গ্রামীণ সড়কে নিয়ন্ত্রণের অভাব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ সড়কে শিশু হতাহতের ঘটনা বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ এসব সড়কের পাশে বসতবাড়ি থাকা এবং যানবাহনের চলাচলে নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও থাকে না। একই সঙ্গে শিশুরা নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান পায় না।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুদের জন্য নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। অথচ সড়কের অব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার ঘাটতিতে সেই সম্ভাবনার অকাল অবসান ঘটছে।



