ইইউর চাপে নীতিমালা বদলাচ্ছে এনবিআর

সংগৃহীত ছবি
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আপত্তির পর অবস্থান বদলাতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন নীতিতে আনা হচ্ছে পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের আইনি অনিশ্চয়তা দূর করতে এনবিআর এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে থেকেই বৈধভাবে পরিচালিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নের পথ উন্মুক্ত রাখতে কাজ চলছে। এজন্য নতুন বিধিমালায় স্পষ্ট ও নমনীয় বিধান যুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান হলো এমন একটি লজিস্টিকস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, যা রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহন, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ডকুমেন্টেশন এবং শিপমেন্ট সমন্বয়ের কাজ করে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্য সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়।শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ে জটিলতার বিষয়টি সামনে আসে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স রুলস, ২০২৫-এর খসড়া প্রকাশের পর। খসড়ায় ২০০৮ সালের বিধিমালার আওতায় অনুমোদন পাওয়া শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বিধান রাখা হয়নি। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ইউরোপীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে, এই অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা ও আইনি বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
এরপরই বিষয়টি কূটনৈতিক পর্যায়ে গড়ায়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, ডেনমার্ক দূতাবাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম) পৃথকভাবে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের বিধান স্পষ্ট করার আহ্বান জানায়। ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বিষয়টি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ইস্যু। লাইসেন্স নবায়নের নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এ বিষয়ে আগামীর সময়কে বলেছেন, খসড়া বিধিমালা প্রকাশের পর বিভিন্ন অংশীজনের কাছ থেকে মতামত পাওয়া গেছে। সেসব মতামত পর্যালোচনায় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউরোচ্যাম বলেছে, ২০০৮ সালের বিধিমালার আওতায় শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ব্যবসার অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের সংশোধনীতে বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণের পর আগে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা রাখা হয়নি। ফলে প্রায় এক দশক ধরে নীতিগত অনিশ্চয়তা বহাল রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদেশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নতুন বিধিমালায় ‘গ্র্যান্ডফাদারিং’ ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। ২০০৮ সালের বিধিমালার অধীনে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আগের শর্তেই লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দিতে হবে বলে তারা দাবি করছে। তাদের যুক্তি, নতুন বিধান পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর করা হলে তা বিনিয়োগ সুরক্ষার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় আইনি বিরোধও এড়ানো যাবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ২৬০টি লাইসেন্সধারী ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি বিদেশি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সহসভাপতি নুরুল আমিন বলেছেন, আগে থেকেই বৈধভাবে পরিচালিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নে আপত্তির কোনো কারণ নেই। তবে নতুন করে শতভাগ বিদেশি মালিকানার জন্য এই খাত উন্মুক্ত করার প্রয়োজন নেই। তার মতে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত দেশীয় উদ্যোক্তা ও দক্ষ জনবল রয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)ও প্রস্তাবিত বিধিমালায় একাধিক সংশোধনের সুপারিশ করেছে। সংগঠনটির দাবি, বিল অব লেডিং (বিএল) সংশোধনের সুযোগ রাখা, কাস্টমস লাইসেন্সধারীদের দায়দায়িত্ব যৌক্তিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতির সঙ্গে বিধিমালার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং চার্জের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হলে রপ্তানি বাণিজ্যে জটিলতা এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে।




