বিশ্ব মেরিটাইম দিবস ২০২৬
সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের সময়

২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব মেরিটাইম দিবস সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে একটি মৌলিক প্রশ্ন নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে—আমরা কি কেবল সামুদ্রিক নীতিমালা, কৌশলগত পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক আইনি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি বিশ্বমঞ্চে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপান্তর করব?
এ বছরের বিশ্ব মেরিটাইম দিবসের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য 'From Policy to Practice: Powering Maritime Excellence' বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান সামুদ্রিক জাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামুদ্রিক উৎকর্ষ বা ‘মেরিটাইম এক্সিলেন্স’ কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। কেবল কাগজে-কলমে অনুমোদিত খসড়া নীতিমালার মাধ্যমেই এটি অর্জিত হয় না। এটি বাস্তবে রূপ নেয় মূলত দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, সুদৃঢ় আইন প্রয়োগের পরিবেশ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সময়োপযোগী বৈশ্বিক ও দেশীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে।
এই প্রতিপাদ্যের মূল কথা হলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ ও চুক্তিতে স্বাক্ষর করা অথবা জাতীয় পর্যায়ে একটি আদর্শ নীতিমালা গ্রহণ করা একটি দীর্ঘ ও কৌশলগত প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। এর আসল সুফল ও অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয় তখন, যখন সেই নীতিগুলো মাঠপর্যায়ে, বন্দরে, জাহাজে এবং সামুদ্রিক সেবামূলক অর্থনীতিতে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক অঙ্গীকারে বাংলাদেশ
বিগত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে আইএমও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ-সুরক্ষা, সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ, নাবিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বহুসংখ্যক আন্তর্জাতিক কনভেনশন, প্রটোকল, আইন ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে। এসব নিয়ন্ত্রক চুক্তি বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিবহনকে একটি পরিচ্ছন্ন, সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ নিয়মনীতির আওতায় এনেছে।
কিন্তু নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হাসিল করতে হলে কেবল আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষভুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; সেগুলোকে দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামোতে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত ও কার্যকর করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, উপযুক্ত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের নিবিড় অংশীদারত্ব।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে, এসডিজি ১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম), এসডিজি ১৪ (জলজ জীবন ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ), এসডিজি ৯ (শিল্প, অবকাঠামো ও উদ্ভাবন) এবং এসডিজি ১৭ (উদ্দেশ্য পূরণে অংশীদারত্ব)। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং টেকসই নৌ-অবকাঠামো তৈরির যে আন্তর্জাতিক তাগিদ রয়েছে, তা এই বৈশ্বিক লক্ষ্যের মূল ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষায় বাংলাদেশ সবসময়ই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ আইএমও-র ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক কনভেনশন ও প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: SOLAS, 1974 (সামুদ্রিক জীবন রক্ষা সংক্রান্ত কনভেনশন), LOAD LINES, 1966 (জাহাজের পানির রেখা ও লোড নির্ধারণ), STCW, 1978 (নাবিকদের প্রশিক্ষণ, সনদ ও ওয়াচকিপিং মানদণ্ড), MARPOL 73/78 (জাহাজজনিত সামুদ্রিক দূষণ প্রতিরোধ), Maritime labour Convention (MLC 2006)।
সম্প্রতি, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে আরও তিনটি ঐতিহাসিক আইএমও কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো, CLC Protocol 1992 (তেল দূষণজনিত বেসামরিক দায়বদ্ধতা), Bunker Convention, 2001 (জাহাজের বাংকার তেল দূষণসংক্রান্ত দায়বদ্ধতা), Nairobi Wreck Removal Convention, 2007 (সমুদ্রে নিমজ্জিত জাহাজ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ)
এসব পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল করেছে, তেমনি যেকোনো সম্ভাব্য সামুদ্রিক দূষণ ও দুর্ঘটনার বিপরীতে আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতের আইনি পথও উন্মুক্ত করেছে। তবে আলোচনার বিষয়, আইনগুলো কি আমাদের সমুদ্রবন্দর, জাহাজ ও শিল্প কারখানায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে?
মানবসম্পদের কেন্দ্রবিন্দু: বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি
বাংলাদেশের মেরিটাইম অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হলো মানবসম্পদ। এই সম্পদ তৈরির দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার অন্যতম আলোকবর্তিকা হলো কর্ণফুলীর মোহনায় জুলদিয়ায় অবস্থিত ‘বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি’।
১৯৬২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ‘মার্কেন্টাইল মেরিন একাডেমি’ হিসেবে এর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একাডেমির কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। ১৯৭২ সালের শুরুতে বাংলাদেশ সরকার একাডেমির পুনরায় কার্যক্রম চালু করে। তৎকালীন মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন এম. এল. রহমানকে কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একাডেমির হাল ধরতে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি মার্চেন্ট মেরিন ক্যাপ্টেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তৎকালীন কমান্ডার (পরবর্তীকালে নৌবাহিনী প্রধান) এম. এ. খানের দূরদর্শী প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ‘ব্রিটিশ টেকনিক্যাল কো-অপারেশন’ প্রকল্পের আওতায় একাডেমি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব লাভ করে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তার গতিশীল নেতৃত্বে একাডেমি আধুনিক সামুদ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মজবুত ভিত গড়ে।
আজ একাডেমি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ব জুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। ১৯৬২ সালে মাত্র ৪৪ জন ক্যাডেট নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন প্রতিবছর পুরুষ ও নারী মিলে প্রায় ১৮০ জন ক্যাডেট ভর্তি হন। একাডেমির পুরো প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত এবং আন্তর্জাতিক STCW কনভেনশনের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে। ক্যাডেটরা বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির অধীনে নটিক্যাল সায়েন্স ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি প্রি-সি পেশাগত লাইসেন্স পান। ২০০০ সালেই বাংলাদেশ আইএমও-এর মর্যাদাপূর্ণ হোয়াইট লিস্টে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো সামুদ্রিক খাতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি। ১৯৯৬ সালে প্রথম নারী ক্যাডেট অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ সামাজিক রক্ষণশীলতায় আটকে ছিল। পরে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ব্যাচে ১৬ জন নারী ক্যাডেট ভর্তির মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এ পর্যন্ত একাডেমি থেকে ১২৫ জনেরও বেশি নারী মেরিন অফিসার দেশি-বিদেশি জাহাজে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কর্মরত। তারা সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা অচলায়তন ভেঙে দিয়েছেন। তারা সমুদ্রগামী জাহাজ, তীরভিত্তিক সামুদ্রিক প্রতিষ্ঠান, সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে ক্যারিয়ার গড়ে অনুকরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করছেন।
নাবিক থেকে তীরভিত্তিক ব্লু-ইকোনমি
বাংলাদেশি নাবিকরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বৃহত্তম চালিকাশক্তি। কেবল বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির গ্র্যাজুয়েটরাই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে প্রতিবছর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) মার্কিন ডলার যোগ করছেন।
বাংলাদেশে এখন অভিজ্ঞ মাস্টার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং দক্ষ মেরিন প্রফেশনাল আছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় ও দেশীয় বিজনেস ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে নিজস্ব ‘শিপ ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গড়ে উঠবে। এই খাত গড়ে উঠলে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা বিদেশ না গিয়ে দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস সরবরাহ করতে পারবেন, যা বিপুল পরিমাণ উচ্চদক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং রেমিট্যান্সের টেকসই প্রবাহ বজায় রাখবে।
একটি সমন্বিত সামুদ্রিক মূল্য শৃঙ্খল
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশাপাশি পায়রা এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সমুদ্র বাণিজ্যের বিশাল হাব হিসেবে গড়ে তুলছে। এই অবকাঠামোকে পুরোপুরি লাভজনক করতে হলে গোটা মেরিটাইম সেক্টরকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি ‘সমন্বিত সামুদ্রিক মূল্যশৃঙ্খল’ এর অধীনে আনতে হবে।
জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত ও ড্রাই-ডকিং, আন্তর্জাতিক শিপ রিসাইক্লিং, পোর্ট অপারেশনস, শিপিং এজেন্সি, মেরিন ইন্সু্যরেন্স ও আইনি সহায়তা—এসব খাতকে যদি একক জাতীয় সামুদ্রিক ব্লু-প্রিন্টের আওতায় যুক্ত করা যায়, তবেই বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত সুবিধাকে শতভাগ অর্থনীতিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
আগামী দিনের পথনকশা
বিশ্ব মেরিটাইম দিবস ২০২৬ উদযাপন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি থেকে বাস্তবে রূপান্তরের জন্য জরুরি ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে:
১. আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলো জাতীয় আইনে কার্যকরকারিতা যাচাই
২. সামুদ্রিক প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সক্ষম
৩. আমাদের প্রধান বন্দরগুলো কতটা দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর
৪. নাবিক ও সামুদ্রিক পেশাজীবীদের দক্ষতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো
৫. নারী পেশাজীবীদের জন্য বিস্তৃত সুযোগ তৈরি
৬. শিপিং ম্যানজেমেন্ট ও শোর বেইজড মেরিটাইম সার্ভিসকে সম্প্রসারণ
৭. সামুদ্রিক অবকাঠামোকে আরও নিরাপদ সবুজ ও জলবায়ু সহনশীল করা
৮. সবশেষে আর্ন্তজাতিক মানদণ্ড ও নীতিমালাকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেয়া।
উপসংহার
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সর্বোচ্চ মানের দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বঙ্গোপসাগর আমাদের জন্য শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক বিশাল ক্ষেত্র। এখন সময় সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। নীতি থেকে বাস্তবায়ন এবং সম্ভাবনা থেকে সামুদ্রিক উৎকর্ষের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
হ্যাপি ওয়ার্ল্ড মেরিটাইম ডে!
লেখক : কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি




