নতুন বছরেই চালু হচ্ছে গ্রাম সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আগামী বছরই দেশে চালু হচ্ছে গ্রাম সরকারব্যবস্থা। গ্রামীণ জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। জানা গেল, দুর্গাপূজার ছুটির পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই উঠতে যাচ্ছে এ বিষয়ে প্রস্তাব। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে প্রস্তাব তোলার নির্দেশনা দেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি আগামীর সময়কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গতকালের বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে চার-পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে যা যা করণীয় তার সব কিছু করতে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে ছিলেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, পরিকল্পনা কমিশনের কাছে উত্থাপিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নানা বাহানায় এবং নানা প্রশ্ন তুলে বিলম্বিত হয় বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য। এতে উন্নয়নকাজ ব্যাহত ও বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। ফলে প্রকল্পগুলো যত দ্রুত সম্ভব পাস করার নির্দেশনা আসে বৈঠক থেকে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানালেন, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় আসে। সরকারপ্রধানও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখান। ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ‘২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন’ পরিমার্জন করে নতুন আইনের খসড়া তৈরিও করে মন্ত্রণালয়। এতে বহাল রাখা হয়েছে আগের আইনের কাঠামো। তবে সদস্য নির্বাচন, প্রতিনিধিত্বের ধরন, সদস্যসংখ্যা ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
খসড়া অনুযায়ী গ্রাম সরকারে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্য উপদেষ্টা হবেন। সদস্যদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে। এক্ষেত্রে মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
এই সরকারের অন্যতম কাজ হবে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদক ও জুয়া প্রতিরোধ, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সমবায়, কুটিরশিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করা। পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায়ও সহায়তা করবে গ্রাম সরকার।
দেশে গ্রাম সরকারব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে গ্রামপর্যায়ে ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে এটি হয়। পরে গ্রামপর্যায়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন’ করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নতুন করে হয় ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’। আইনটি প্রণয়নের পরপরই এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট গ্রাম সরকার আইনকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, ২০০৩ সালের আইনে গ্রাম সরকারের অধিকাংশ সদস্য মনোনীত হওয়ার সুযোগ থাকায় তা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার লিভ টু আপিল করলেও তা খারিজ হয়ে যায়। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে ‘গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল’ পাস করে নেয়। ফলে ২০০৩ সালের আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হয়ে যায়।
তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংসদে আইনটি বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছিলেন, গ্রাম সরকার স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর কোনো অবদান রাখতে পারেনি। এর তহবিল তছরুপ ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগও উঠেছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।



