যেমন খুশি তেমন বাড়ছে ট্রাকভাড়া, নেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ

পণ্যবাহী ট্রাক—ফাইল ছবি
এক জেলা থেকে আরেক জেলায় পণ্য পাঠাতে সোমবার ট্রাকভাড়া যা ছিল, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মঙ্গলবার সেই ভাড়া কত হবে—তার কোনো নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই।
পণ্য পাঠানো ব্যবসায়ীকে ট্রাকমালিকের সঙ্গে দর-কষাকষি করেই ঠিক করতে হচ্ছে ভাড়া। কোথাও বাড়ছে কয়েক হাজার টাকা, কোথাও তার চেয়েও বেশি। নির্দিষ্ট কোনো ভাড়া পদ্ধতি না থাকায় একই দূরত্বের পণ্য পরিবহনেও বাড়ছে ব্যয়ের পার্থক্য।
অন্যদিকে যাত্রী পরিবহনের বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ানোর জন্য চলছে সরকারি প্রক্রিয়া। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর আজ সোমবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে বাসমালিকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক হচ্ছে। নতুন জ্বালানি দামে বাস পরিচালন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তা হিসাব করে ভাড়া সমন্বয়ের আলোচনা চলছে। এরপর নির্ধারিত ভাড়া প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
কিন্তু পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে এমন কোনো সরকারি ভাড়া কাঠামো নেই। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন মালিকরা বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে ভাড়া নির্ধারণ করছেন। যে পণ্য পাঠাতে যত ভাড়া আদায় করা সম্ভব হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই হয়ে উঠছে কার্যকর ভাড়া। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এতে পণ্য পরিবহনের ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে।
সোমবার থেকে নতুন দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। একইভাবে পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহন খরচে। কারণ ট্রাক পরিচালনার প্রধান ব্যয়ের একটি জ্বালানি। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়ার পর ট্রাকভাড়া কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে সরকারের নির্ধারিত কোনো হার না থাকায় ভাড়ার পুরো বিষয়টি চলে যাচ্ছে বাজারের ওপর। চাহিদা বেশি থাকলে মালিক বেশি ভাড়া চাইছেন, আবার কোনো রুটে ট্রাকের সরবরাহ বেশি থাকলে দর-কষাকষির সুযোগ থাকছে। ফলে ভাড়া নির্ধারণে এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসের ক্ষেত্রে ভাড়ার একটি কাঠামো রয়েছে। এ কারণে বাসের ভাড়া নিয়ে অন্তত একটি সরকারি বেঞ্চমার্ক থাকে। সর্বশেষ এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর মহানগর ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।
পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে সেই কিলোমিটারভিত্তিক কাঠামো নেই। ফলে একজন ব্যবসায়ীকে পণ্য পরিবহনের আগে জানতে হচ্ছে—আজ ওই রুটে ট্রাক পাওয়া যাবে কি না, পাওয়া গেলে মালিক কত ভাড়া চাইছেন এবং দর-কষাকষিতে কতটা কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারেও। ট্রাকভাড়া কতটা বাড়ল, তার ওপর নির্ভর করে পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপর চাপার ঝুঁকি থাকে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, যাত্রী পরিবহনের ভাড়া যদি সরকার কিলোমিটারভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি স্বচ্ছ ভাড়া কাঠামো থাকবে না কেন। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার পর যখন পরিবহন ব্যয় নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তখন ট্রাকভাড়া নির্ধারণে একটি সরকারি নির্দেশনা বা রেফারেন্স রেট থাকা দরকার কি না—সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।



