লাভলেনের বাহার পান!

চট্টগ্রামের পুরনো শহরের ভেতরে ঢুকলেই একসময় বাতাসে মিশে আসে এক অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ। সেই গন্ধে আছে জাফরান, গোলাপ, এলাচি, সুপারি, চুন আর পানের মোলায়েম মিশেল। যেন কোনো পুরনো প্রেমপত্রের ভাঁজ খুলে বসে আছে শহর। সেই পথের নাম—লাভলেন।
নামের মধ্যেই যেন প্রেম প্রেম ভাব! ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে এখানে ইংরেজ কর্মচারীদের বসবাস ছিল। কেউ বলেছেন, ইংরেজদের দেওয়া নাম এটি। আবার কেউ বলছেন, খোলামেলা প্রেম করা ইংরেজ তরুণ-তরুণীদের দেখে স্থানীয়রাই জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন ‘লাভলেন’। ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর বই ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’-এও মিলেছে এমন তথ্য।
ডিসি হিল, মোমিন রোড, এনায়েত বাজার আর জুবিলি রোডঘেরা এক বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট এলাকায় আজও সেই পুরনো চট্টগ্রামের গন্ধ টিকে আছে। যার আধা কিলোমিটার দূরেই স্টেডিয়াম।
লাভলেনের সবচেয়ে বড় পরিচয়— এখানকার পান। বাংলার অতিথি আপ্যায়নে পানের গল্প বহু পুরনো। একসময় ভরপেট ভোজের পর পান ছাড়া যেন আয়োজনই সম্পূর্ণ হতো না। বিয়ে, আকিকা, মিলাদ, গায়েহলুদ— সবখানেই পানের থালা ঘুরে বেড়াত অতিথিদের হাতে হাতে। ঠোঁট লাল করা থেকে শুরু করে মুখে সুগন্ধ আনা— সবকিছুর সঙ্গে এখনো জড়িয়ে পান।
এখন সময় বদলেছে। কিন্তু পানের আবেদন কমেনি। বরং রঙিন মশলা, বাহারি সাজ আর নতুন নতুন স্বাদে পান যেন নতুন যুগে আবার ফিরে এসেছে।
এই স্বাদের খোঁজেই ঢু মারা লাভলেনের বিখ্যাত দোকান ‘পারভীন স্টোর বেনারসি পান ঘর’-এ। দোকানে সাজানো নানা নামের পান— জাফরানি শাহি পান, এলাচি রসা শাহি পান, বেনারসি শাহি পান, বাহার পান। প্রতিটির আলাদা গন্ধ, আলাদা রঙ, আলাদা গল্প।
দোকানের মালিক ফারুক পান সাজাতে সাজাতে বলছিলেন, ‘পান তো অনেক জায়গাতেই হয়। কিন্তু আমি মহেশখালীর পান ব্যবহার করি। ওই পানের স্বাদ মিষ্টি।’
তার কথার সঙ্গে যেন মিলে যায় আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালী ঘোষের গানের সেই লাইন— ‘যদি সুন্দর একখান মুখ ফাইতাম, মইশখাইল্যা পানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম...’
এখানে পানের দাম ৬ টাকা থেকে শুরু হয়ে পৌঁছায় ৩০০ টাকায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘জাফরানি শাহি পান’-এর দাম মাত্র ১০ টাকা। ২০ টাকায় ‘এলাচি শাহি পান’, ৩০ টাকায় ‘এলাচি রসা শাহি পান’ আর ৫০ টাকায় ‘বেনারসি শাহি পান’। সবচেয়ে বেশি কৌতূহল জাগায় ৩০০ টাকার ‘বাহার পান’। এই পানে ব্যবহার করা হয় কস্তুরি— ভারত থেকে আনা এক মূল্যবান উপাদান। ছোট্ট এক কৌটার দামই প্রায় ৬ হাজার টাকা। ফারুকের ভাষায়, ‘একটা পানে ৩০ রকমের মসলাও যায়।’
শুধু দেশি উপকরণ নয়, অনেক মসলাই আসে বিদেশ থেকে। ইরান ও পাকিস্তান থেকে আসে ‘গাবা’, যা এলাচি রসা পানে ব্যবহার হয়। আছে জাফরান, কাঠবাদাম, গোলাপের পাপড়ি, বিশেষ আয়ুর্বেদিক মসলা।
পান বানানোর পুরো প্রক্রিয়াটাও যেন এক শিল্প। পাতার ওপর একের পর এক মসলা সাজানো হয়। কোথাও মিষ্টির নরম ছোঁয়া, কোথাও ঝাঁজালো সুগন্ধ। শেষে খিলি বানিয়ে হাতে তুলে দিলে মনে হয় ছোট্ট কোনো শিল্পকর্ম।
চট্টগ্রামের বাইরে এই পানের খ্যাতি এখন আরও দূর ছড়িয়েছে। ঢাকা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বড় বিয়ে আর সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত যায় লাভলেনের পান। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খানও মেয়ের বিয়েতে অতিথিদের জন্য এনেছিলেন এখানকার পান।
কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। হেসে উঠে বলছিলেন, ‘মুরগির রোস্ট কিংবা কোর্মা এক পিস খেলেও মানুষ পান খেয়েছে দু-তিনটি। লাভলেনের পান ঢাকায় খুব পপুলার।’
শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও পৌঁছে গেছে এই স্বাদ। কেউ দুবাই নিয়ে যান, কেউ বিদেশফেরত আত্মীয়ের জন্য কিনে নেন। সতেজ রাখতে কলাপাতায় মুড়ে কিংবা বিশেষ আইস বক্সে করে পান পাঠিয়ে দেন দোকানিরা। তাতে তিন-চার দিন পর্যন্ত টাটকা থাকে পান।
আজও লাভলেনের সরু গলিতে সন্ধ্যা নামলে ভিড় জমে পানের দোকানগুলোয়। কেউ মিষ্টি পান খায়, কেউ জর্দা ছাড়া সাদা পান, কেউ আবার বাহার পানের স্বাদ নিতে এসে ছবি তুলে রাখেন স্মৃতির জন্য।
চট্টগ্রামের এই ছোট্ট গলিতে দাঁড়িয়ে তখন মনে হয়— পান আসলে শুধু মুখরোচক কিছু নয়, এটি এক টুকরো সংস্কৃতি, এক চিলতে স্মৃতি, আর পুরনো বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক মিষ্টি ঐতিহ্য।






