অথচ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কবি শামসুর রাহমান একবার বলেছিলেন, ‘মানবিক গুণ না থাকলে আমরা খ্রিস্টানই হই, বৌদ্ধই হই, মুসলমানই হই— সেটি খুবই অর্থহীন। আসলে মানুষ হতে হবে। আমি মনুষ্যত্ব অর্জনের সাধনায় রত আছি।’
এ কথাটি মনে পড়ার একটি বিশেষ কারণ আছে। কদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সোশ্যাল মিডিয়াসহ অনেক গণমাধ্যমে একটি খবর বেশ চাউর হয়েছে। এটি হলো— ‘তিন মাস ধরে কাদায় বাঁধা ছিল চারটি মহিষ, উদ্ধার করলেন ইউএনও’ এই শিরোনামে। খবর থেকে যা জানলাম, তার সারসংক্ষেপ— বাড়ির চারপাশ কাদায় সয়লাব। তিন মাস সেই কাদার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা বাঁধা ছিল আবদুল আলিমের চারটি মহিষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পেয়ে মহিষগুলো উদ্ধার করলেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
উপজেলার গোকুলনগর গ্রামের আবদুল আলিমের বাড়িতে গিয়ে মহিষগুলো উদ্ধার করে বাড়ির পাশেই শুকনো জায়গায় নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন ইউএনও মো. সাজ্জাদ হোসেন। সেই সঙ্গে তিনি ১৫ দিনের মধ্যে মহিষগুলো রাখার জন্য ভালো জায়গা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গোকুলনগর গ্রামের মৃত ফজর আলীর ছেলে আবদুল আলিম তার চারটি মহিষ বাড়ির পাশে কাদার মধ্যে বেঁধে রাখেন। আগে মহিষগুলো মাঠে চরাতে নিয়ে গেলেও বর্ষার কারণে তিন মাস ধরে তা সম্ভব হচ্ছে না। সারাক্ষণ এই কাদার মধ্যে বাঁধা ছিল, বিষয়টি এলাকার অনেকে মেনে নিতে পারছিলেন না।
বুঝলাম— বৃষ্টি ও কাদায় মহিষগুলো যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু এর বিকল্প কি তিন মাস ধরে কাদায় আটকে রাখা? তার বিবেকবোধ একবারের জন্যও জাগ্রত হলো না? এলাকাবাসীর অনুরোধ ছিল; কিন্তু এত দুর্বল অনুরোধ কেন? আর প্রশাসনকে জানাতে তিন মাস লেগে গেল কেন এলাকাবাসীর?
আসলে প্রতিবাদ করতে না পারার অভ্যাস আমাদের উটপাখি বানিয়েছে। আমরা সবাই এখন উটপাখি। অন্যায় দেখলে মাথা গুঁজে থাকি। কেউ কেউ ব্যথিত হওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু দায়িত্ব নিই না। তাই প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলাম প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের কাছে।
অন্যায় দেখে নীরব থাকা মানে শুধু অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়, অন্যায়কারীর শক্তি বাড়িয়ে দেওয়া। যখন বিবেকের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কষ্টও আমাদের স্পর্শ করে না। যেমন মহিষগুলোর কান্না আমাদের স্পর্শ করেনি। প্রতিবাদের সাহস হারালে সমাজ ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সে ইতিহাস আমাদের জানা আছে। বিবেক জাগ্রত না হলে মানুষ বেঁচে থাকে, মানবিকতা নয়।






