জন্মদিনে স্মরণ
ইসলামপুরের সেই বাড়িটি ...
- মাদার তেরেসা

মাদার তেরেসা
বাইরের কোলাহল আর রিকশার টুংটাং আওয়াজ থেমে যায় ভবনটির ভেতরে পা রাখতেই। পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ঘিঞ্জি হাঁকডাকের মধ্যেও এখানে সব শোর-সরাবত মিলিয়ে যায় এক নিমেষেই। শীর্ণ দেয়ালে হাত বোলালে আজও যেন টের পাওয়া যায় এক বৃদ্ধা নারীর স্নেহের পরশ। নীল পাড়ের সাদা সুতি শাড়িতে জড়ানো সেই পরম মমতাময়ী মাদার তেরেসা।
১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের আকাশের একদিকে ছিল বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে স্বজন হারানোর গুমোট শোক। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের তাণ্ডবে চারদিকে তখন যুদ্ধশিশুর আর্তনাদ আর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার লাখ লাখ বীরাঙ্গনার নীরব আহাজারি। দেশের সীমা পেরিয়ে সেই আহাজারির অশ্রুত শব্দ পৌঁছে গিয়েছিল মাদার তেরেসার কানে। সমাজ যখন এসব ‘অচ্ছুৎ’ নারী-শিশুদের কীভাবে গ্রহণ করবে তা নিয়ে দ্বিধায়, ঠিক তখনই সীমান্ত পেরিয়ে ঢাকায় পা রাখেন মহীয়সী মাদার তেরেসা। কোনো রাজনৈতিক ভাষণ বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন নিখাদ ভালোবাসা নিয়ে। সেবা আর নির্মল আনন্দে এসব নারী ও শিশুর জীবন পূর্ণ করতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ইসলামপুরে প্রতিষ্ঠা করলেন এক টুকরো নিভৃত স্বর্গ— মিশনারিজ অব চ্যারিটি শিশু ভবন। এই বাড়িটি শুধু ইটের ইমারতই নয়; বরং রক্ত, কান্না আর স্বাধীনতার আগুনে পোড়া বাংলাদেশের বুকে মাদার তেরেসার নিজ হাতে আঁকা প্রথম ভালোবাসার চিহ্ন।
১৯৭১ সালে যেসব বীরাঙ্গনা সামাজিক লজ্জার ভয়ে মুখ লুকিয়েছিলেন তাদের জন্য এই ভবনটি হয়ে উঠেছিল নিরাপদ আশ্রয়। মাদার তেরেসা তাদের বুঝিয়েছিলেন— জাতির জন্য লজ্জার নন; বরং তারা বীর। প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছর পর, পুরান ঢাকার এই শিশু ভবন আজও রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া পিতৃমাতৃহীন নবজাতক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অবুঝ শিশু এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানদেরও পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নেন। বর্তমানে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মা এবং অসহায় নারী; সব মিলিয়ে শতাধিক মানুষ থাকেন শিশু ভবনে। এ ছাড়া মাসে একবার এখান থেকে কুষ্ঠ রোগীদের দেওয়া হয় রেশন। গরিব ও বিকলাঙ্গ শিশুদের বিনামূল্যে দেওয়া হয় চিকিৎসা, ওষুধ।
গত রবিবার শিশু ভবনে গিয়ে দেখা মেলে ফ্রান্সিস, মারিও, জাসিন্তা, মাইকেল, সোনালী, মার্ক, গ্রেসির মতো অনাথ শিশুদের। যাদের জন্য এই শিশু ভবনই নিজ পরিবার। বিকালের নাশতা খেতে খেতে ছয় বছরের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মল্লিকাকে দেখা গেল দোলনায় দোল খেতে। হঠাৎই দায়িত্বরত এক সিস্টারকে দেখে কাছে গিয়ে তার হাতে চুমু খেয়ে ছুট দিলেন বাকি বন্ধুদের খোঁজে। মল্লিকার চোখেমুখে লেপ্টে থাকা আনন্দ যে কাউকেই মনে করিয়ে দেবে মাদার তেরেসার অমর বাণী, ‘কেবলমাত্র সেবা বা দান করাই যথেষ্ট নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আসল সেবা।’
বাংলাদেশের সঙ্গে মাদার তেরেসার সম্পর্ক শুধু ১৯৭২ সালেই আটকে থাকেনি। এরপরও তিনি বিভিন্ন সময়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর যখন বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষা এলাকাগুলো লাশের মিছিলে ভাসছিল তখন এই বৃদ্ধা সেবিকা উপকূলীয় এলাকায় নিজে হেঁটে হেঁটে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বজনহারা মানুষের হাতে। শুধু বাংলাদেশ নয়— বিশ্বের ১০০-র বেশি দেশে সেবার কাজে গিয়েছেন ছুটে। ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট মেসিডোনিয়ার স্কোপিয়েতে (অটোমান সাম্রাজ্য) জন্ম নেওয়া অ্যাগনেস গঞ্জা বোজাঝিউ এভাবেই পুরো পৃথিবীর ‘মাদার’ হয়ে উঠেছিলেন, তার নিঃস্বার্থ মানবসেবার মাধ্যমে। ১৯৫০ সালে কলকাতায় ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ দিয়ে তার সেবাকাজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। পরে যা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বহু দেশে। ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান মাদার তেরেসা। তবে সেই মঞ্চেও তিনি দাঁড়িয়েছিলেন চরম নম্রতায়। নোবেল জয়ের পর সান্ধ্যভোজ বাতিল করে সেই অর্থ তুলে দিয়েছিলেন ক্ষুধার্তদের মুখে অন্ন জোগাতে।
মাদার তেরেসার সেবা ছিল সর্বজনীন। সব ধর্মের মানুষের জন্যই তিনি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন তেজগাঁও চার্চের প্রধান পুরোহিত জয়ন্ত এস গমেজ। আগামীর সময়কে বললেন, মাদার তেরেসা সবসময় নিপীড়িত মানুষের সেবা করেছেন। তরুণ প্রজন্মের যারা সেবা করতে আগ্রহী তাদের মাদার তেরেসার সেবা উদ্বুদ্ধ করবে। তবে মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত শিশু ভবনের আর্থিক সাহায্য নিয়ে জানালেন শঙ্কার কথাও। বললেন, বিদেশি সাহায্য অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে এই প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয় কখনো কখনো। সেবামূলক কাজ চালিয়ে যেতে হলে অর্থের প্রয়োজন আছে। ফলে সবাইকে আর্থিক সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন।
১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পৃথিবীতে সেবার আলো ছড়ানো এই আত্মাজ্যোতি নিভে যায়। কিন্তু পুরান ঢাকার ইসলামপুরের শিশু ভবনের গলিটাতে আজও সন্ধ্যা নামলে কোনো অনাথ শিশুর হাসির শব্দে কিংবা সিস্টারদের নীরব প্রার্থনায় মাদার তেরেসাকে স্পষ্ট অনুভব করা যায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সেবার কাজের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন গভীর ভালোবাসার।






