লাল কার্পেটে মেহ্রীনের শৈশব: এক বাবার একাকী লড়াই

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বছর পাঁচেক আগের কথা। মেহ্রীনের বয়স ছিল মাত্র ছয়। যখন আর দশটা শিশুর নিজের নরম বিছানায় সকালের ঘুম ভাঙে, তখন মেহ্রীনের সকাল হতো বাবার অফিসের এক কোণে পাতা লাল কার্পেটে। চাকরির দায়িত্ব আর মেয়েকে চোখে চোখে রাখার দায়— এ টানাপড়েনে বাবার অফিসই হয়ে উঠেছিল মেয়ের সাময়িক আশ্রয়।
মেহ্রীনের মা নেই। বাবা শাহ্ নেওয়াজ চাকরিজীবী। কর্মস্থল পুরান ঢাকার টিকাটুলী মোড়ে। মেয়ের জন্য রান্নাবান্নায় অপটু শাহ্ নেওয়াজ আজকাল রান্নার কাজটিও শিখে নিয়েছেন। নিজের একলা জীবনে হোটেলে খেয়ে পেট ভরলেও মেহ্রীনের তো আর সেভাবে চলে না। এখন প্রতিদিনের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া— সব একহাতে সামলান শাহ্ নেওয়াজ। ছুটির পর স্কুলের গাড়ি মেহ্রীনকে দিয়ে যায় বাবার অফিসে। তারপর বাবার মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে বাড়ি পৌঁছায়।
আগে মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে মেয়েকে স্কুলে দিতে যেতেন শাহ্ নেওয়াজ। তবে এই নিয়ে অফিসে ফিরে সহকর্মীদের অভিযোগও শুনতে হয়েছে। অগত্যা তিনি বাধ্য হয়েছেন স্কুলবাসের সাহায্য নিতে। তবুও শাহ্ নেওয়াজ হাল ছাড়েননি। মাঝেমধ্যে নিজের বোনের সাহায্য নিলেও, বেশিরভাগ সময় সব কাজ একা হাতে সামলান— ভীষণ চুপচাপ আর লাজুক স্বভাবের এই বাবা।
মেহ্রীন তার বাবাকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে চায় না। সব পরিস্থিতিতে সে বাবার সঙ্গেই ছায়ার মতো লেগে থাকে। তাইতো স্কুলের বাইরের একটা বড় সময় কাটে বাবার অফিসে। যেন বাবার অফিসেই বন্দি তার শৈশব। এই নিয়ে শাহ্ নেওয়াজের ভারি আক্ষেপ, ‘আমরা নিজেরা যতটা সুন্দর শৈশব পেয়েছি, ও সেটা পাচ্ছে না। এটা ভাবলে খুব খারাপ লাগে।’
যাদের নিজস্ব কোনো আকাশ থাকে না, তারা অন্যের বুকেই নিজেদের আকাশ খুঁজে নেয়। ১১ বছরের মেহ্রীনও আজ তার সমস্ত আকাশ খুঁজে পেয়েছে বাবার বুকে। তার জীবনের গল্পটা অন্য দশটা শিশুর মতো স্বাভাবিক পথে চলেনি, কিন্তু এক বাবার অসীম ত্যাগ আর ভালোবাসায় তা অনন্য হয়ে উঠেছে।
চাকরির বাইরে শাহ্ নেওয়াজের অন্য একটা পরিচয় ছিল। তিনি গান গাইতেন, চমৎকার গিটারও বাজাতেন। এমনকি নিজের একটা মিউজিক স্টুডিও ছিল। সুরের জগতেই কাটার কথা ছিল শাহ্ নেওয়াজের জীবন। কিন্তু জীবনের সুরে যখন একাকিত্বের টান পড়ল, তখন তিনি বেছে নিলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুর— মেয়েকে। তাকে সুন্দর ভবিষ্যৎ আর তাকে একটু বাড়তি সময় দেওয়ার জন্য নিজের সাধের স্টুডিও, গান, গিটার— সবকিছু এক নিমেষে ছেড়ে দিলেন শাহ্ নেওয়াজ। গানের বিনিময়ে তিনি কিনে নিলেন মেয়ের সঙ্গে কাটানো কিছুটা মূল্যবান সময়।
একাকী বাবার লড়াইকে আমাদের সমাজ সবসময় সহজভাবে নিতে পারে না। মাকে নিয়ে ছোট্ট মেহ্রীনকে একসময় শাহ্ নেওয়াজের অফিসের সহকর্মীরা নানাভাবে বিরক্ত করত। ফলে পুরনো অফিস ছেড়ে বর্তমান কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধ্য হন। তবে এখানেও মেহ্রীনকে শিকার হতে হয় একইরকম বুলিংয়ের। এমনকি স্কুলের সহপাঠীদের কাছ থেকেও জোটে অনাকাঙ্ক্ষিত ‘পোক’ বা খোঁচা।
একটা সময় মেহ্রীন তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করত। কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে, বাবার এই একক লড়াই দেখতে দেখতে সেও হয়তো এখন অনেক পরিপক্ব। মায়ের কথা আজকাল জিজ্ঞেস করে না। মায়ের অভাবটা সে বাবার অকুণ্ঠ ভালোবাসা দিয়েই আড়াল করতে শিখে গেছে। মেহ্রীনের পৃথিবী জুড়ে এখন শুধুই তার বাবা।
দ্বিতীয় বিয়ে করেননি শাহ্ নেওয়াজ। চান না কোনো নেতিবাচক প্রভাব মেয়ের ওপর পড়ুক। একজন মানুষ যখন তার ক্যারিয়ার, শখ এবং নিজের সবটুকু আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শুধু সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর লড়াই করেন, তখন সেই লড়াই আর শুধু পিতৃত্বের থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক অনন্য মানবিক দলিল। মেহ্রীন হয়তো রাজপ্রাসাদের মতো শৈশব পায়নি, কিন্তু সে পেয়েছে এমন এক বাবার বুক, যা যেকোনো প্রাসাদের চেয়েও অনেক বেশি নিরাপদ ও উষ্ণ।






