প্রিয় বাবারা কেন খিটখিটে মেজাজের হন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
“বাবা যেদিন সাইকেলটা কিনে দিয়েছিলেন, সেদিনও তাকে ধন্যবাদ বলতে পারিনি। আজ আমি চল্লিশ, বাবা ষাটোর্ধ্ব। ধন্যবাদ দিতে পারি না এখনো। হাতখরচের টাকাটা টেবিলে পেপারওয়েটে চাপা দিয়ে রেখে চলে আসি। বাবার হাতে হাতে দিতে পারি না। অফিসে যাওয়ার বেলায় সন্তানদের বলি, কিছু লাগলে আমাকে জানিও। কিন্তু আজও বাবাকে বলতে পারি না— ‘বাবা, বাইরে বের হলে তোমার কোনো কিছু কিনতে ইচ্ছা করলে আমাকে ফোন করো।’ কারণ আমি বাবাকে ভয় পাই। এটা ঠিক ভয়ও নয়, ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা। অথবা ওই যে ছেলেবেলা থেকে বাবাকে বাঘ মনে হয়।” উত্তরার আতিকুল ইসলামের মতো বাঙালি সব ছেলেমেয়ের মনেই বোধহয় বাবাকে নিয়ে এমন স্মৃতি।
আরেক বাবার বর্ণনা। তারও বয়স পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই। ছেলে আদিব হাসান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন উচ্চ বেতনে। অফিসসুদ্ধ সবাইকে হাসি-আনন্দ আর অনর্গল কথায় মাতিয়ে রাখেন। কিন্তু বাবার সামনে মাথা তুলে আজও কথা বলতে পারেন না। জানিয়েছেন, আজও খুঁটিনাটি কোনো বিষয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে হলে মাধ্যম হিসেবে মাকেই বেছে নেন তিনি। সরাসরি বাবাকে কোনো কথা বলা হয়ে ওঠে না আদিবের।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা সজীবেরও প্রায় একই অবস্থা। সাহস করে বাবার কাছে তেমন কিছু চাইতে পারেননি কোনোদিন। তবে একবার মনে বল নিয়ে চাইতে পারলে সেটা পাওয়া যায় বাবার কাছ থেকে; এ প্রমাণও সজীব বেশ কয়েকবার পেয়েছেন। তিনি জানালেন, এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। আজকাল ভাতিজির সঙ্গে বাবাকে খেলা করতে দেখলে মনে হয়, এই বাবাকে তিনি চেনেন না। শিশুদের মতো খেলা করছে, হাসছে, গড়গড় করে কথা বলছে। সজীবের প্রশ্ন, তাহলে কি বাবা আগে একটা রাগী ভাব নিয়ে থাকত?
ছবিটা দাঁড়াচ্ছে বাবা মানে রাগী, মেজাজি, কঠোর এক ব্যক্তি। কিন্তু কেন বাবারা সবসময় খিটখিটে মেজাজের হয়? বাইরে থেকে তাদের এ রূপটি দেখা গেলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং জৈবিক কারণ।
সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মতে, ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষদের ওপর পরিবারের মূল উপার্জন এবং সুরক্ষার দায়িত্ব থাকে। সমাজ নির্ধারিত দায়িত্বের চাপ, নিজের ভেতরের দুর্বলতা আড়ালের চেষ্টা এবং সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার অতিরিক্ত চিন্তাই তাদের আচরণে কঠোরতা নিয়ে আসে।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সুরক্ষিত রাখার অবিরাম মানসিক চাপ অনেক সময় বাবাদের স্বভাবকে খিটখিটে করে তোলে। তারা তাদের ভেতরের ভয় বা দুশ্চিন্তা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না, যা রাগ হিসেবে প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের বাবাদের কঠোর হওয়ার একটা কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। ছোটবেলা থেকেই এখানে ছেলেদের শেখানো হয়— ‘ছেলেরা কাঁদে না’ বা ‘পুরুষ মানুষকে শক্ত হতে হয়’। আজও সমাজ নারীর কাজে সহায়তাকারী পুরুষকে স্ত্রৈণ বলে গালি দেয়। ফলে নানা কারণে পুরুষ নিজেকে কঠোর দেখাতে পছন্দ করে। তারা দুঃখ, ভয় বা দুর্বলতার মতো স্বাভাবিক আবেগগুলো প্রকাশ করতে না পেরে তা মনের কোণে লুকিয়ে রাখে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা এ আবেগগুলো একসময় খিটখিটে মেজাজ বা কঠোরতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. রোনাল্ড এফ লেভান্ট তার নর্মেটিভ মেল অ্যালেক্সিথাইমিয়া (Normative Male Alexithymia) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, সামাজিকীকরণের কারণে পুরুষরা তাদের নিজেদের আবেগ বুঝতে এবং তা অন্যকে বুঝিয়ে বলতে সমস্যায় পড়েন, ফলে তারা কঠোর আচরণ বেছে নেন। এসব কারণের বাইরে অনেক বাবা মনে করেন, অতিরিক্ত নরম বা বন্ধুত্বপূর্ণ হলে সন্তানরা বিপথে যেতে পারে বা তাদের কথা শুনবে না। এটাও বাবাদের কঠোর হওয়ার একটা কারণ। আবার অনেক বাবা শাসন করাকেই তাদের ভালোবাসার ভাষা মনে করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বাবাদের এই রাগী, কঠোর মেজাজকে তুলনা করেছেন ঝিনুকের সঙ্গে। তার ভাষায়, ঝিনুকের বাইরের খোলস শক্ত, ভেতরে নরম। যার ভেতর মুক্তা জন্মায়। বাবারা হলেন এমন মানুষ যারা সামাজিক, পারিবারিক এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব একসঙ্গে নেন। এমনকি পরিবার বা সন্তানের সুরক্ষাও তিনি দেখেন। ফলে তাকে একটা চরিত্র দাঁড় করাতে হয়, যেটাকে দেখে পারতপক্ষে মনে হবে ভাঙা কঠিন। যদিও দিন দিন দেশে বাবাদের এ ভূমিকায় পরিবর্তন আসছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, বাবারা জন্মগতভাবে রাগী বা কঠোর হন না। ভেতরে ভেতরে তারা ঠিকই সন্তানের মঙ্গল চান; কিন্তু প্রকাশের মাধ্যমটি অনেক সময় রুক্ষ হয়ে যায়। তবে বর্তমান প্রজন্মের বাবাদের অনেকেই খোলামেলা আলোচনায় বিশ্বাসী, যা হয়তো আগের প্রজন্মের বাবারা দেখেননি। আজকাল বাবারা সন্তান লালন-পালন বা প্যারেন্টিংয়ে মায়েদের সঙ্গী হচ্ছেন। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।




