কিন্তু

একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল লঞ্চ। তখন লঞ্চযাত্রায় আনন্দের চেয়ে ভোগান্তি ছিল অনেক বেশি। সদরঘাটে এসে কেবিনের জন্য ছোটাছুটি, ডেকে জায়গা দখলের যুদ্ধ, ভিড়ের মধ্যে ব্যাগ সামলানো— সব মিলিয়ে লঞ্চযাত্রা ছিল ভ্রমণের পাশাপাশি এক ধরনের বীরত্বের পরীক্ষা। কিন্তু পদ্মা সেতু হওয়ার পর সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। যাত্রী কমেছে, ভোগান্তি প্রায় উধাও। এখন যারা লঞ্চে ওঠেন, তাদের অনেকেই গন্তব্যে যাওয়ার চেয়ে নদীর বুকে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ নিতেই যেন ওঠেন। তাই লঞ্চযাত্রা না বলে ‘নৌভ্রমণ’ বলতেই ভালো লাগে।
দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চগুলোয় ভ্রমণের মজাই আলাদা। নদীর বুক চিরে ছুটে চলা তিন-চারতলা বিশাল লঞ্চ, চারপাশে শুধু পানি আর পানি। ছাদে উঠলে মাথার ওপর খোলা আকাশ। তখন মনে হয়— অফিস, সংসার, মোবাইলের নোটিফিকেশন; সবাইকে আজ ছুটি দেওয়া যায়! লঞ্চের বিভিন্ন তলায় ওঠার জন্য লিফট। সামনে এটিএম বুথ। এরপরই দেখা মিলবে সুসজ্জিত কেবিন গেটের। ঢুকেই চোখ কপালে। আধুনিক ডুপ্লেক্স কেবিন, ছিমছাম প্রসাধনসামগ্রী। আরামদায়ক বিছানা— মুহূর্তেই মনে হবে, ভুল করে পাঁচ তারকা হোটেলে চলে এসেছি না তো! জানালা দিয়ে কাশফুল, মাছ ধরার ট্রলার আর নদীর ঢেউ দেখতে দেখতে মনে হবে, সড়কে এতদিন চলেছি কেন?
খাবারের ব্যবস্থাও চমৎকার। ভাত-মাছ ও মাংস থেকে ফাস্টফুড— সবই আছে। কফির পেয়ালা হাতে বারান্দায় বসে শ্যাওলার ভেসে যাওয়া, ছোট-বড় মাছ ধরার নৌকার নাচন— এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় উধাও। রাত নামলে কুপিবাতি জ্বালিয়ে দুলতে থাকা নৌকাগুলো মনে হয় পানির ওপর জোনাকির মেলা। আর পদ্মার পানিতে চাঁদের আলো? মনে হয় নদী আর আকাশ গোপনে প্রেম করছে!
ডেকের দৃশ্য আরও মজার। ম্যাট বিছানো খোলা জায়গা। ওপরে ফ্যান। দুপাশ দিয়ে ঢুকছে বাতাস। এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে চুল। রাত জেগে কেউ গান শুনছেন, কেউ টিভি দেখছেন, আবার কেউ ঘুমিয়ে কাটাচ্ছেন। এভাবে আনন্দে গন্তব্যের আশায় কেটে যায় একটি রাত।
সব মিলিয়ে পদ্মা সেতুর পর লঞ্চের ভোগান্তি কমলেও আনন্দ কমেনি; বরং লঞ্চ এখন অনেকের কাছে যাতায়াতের বাহন নয়, নদীর বুকে ভাসতে ভাসতে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর এক অসাধারণ নৌভ্রমণ। যদি সুযোগ থাকে আপনিও নিতে পারেন এই অসাধারণ নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা।







