সুতরাং

আমার এক আত্মীয় আছেন, যিনি বাসায় বেড়াতে আসার আগে কখনো ফোন করেন না। কারণ, ফোন করলে আমি বাসায় আছি কি না, সেটি জেনে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি সরাসরি চলে আসেন। তারপর এমনভাবে প্রশ্ন শুরু করেন, যেন আমি কোনো অপরাধ করে পালিয়ে আছি। আর তিনি বহুদিন ধরে আমাকে খুঁজছেন।
সেদিন বিকালে এলেন। বসেই বললেন, ‘কী খবর? শরীর ভালো?’
আমি বললাম, ‘জি, ভালো।’
‘চাকরি কেমন চলছে?’
‘ভালো।’
‘বেতন বাড়ছে?’
আমি একটু ইতস্তত বোধ করলাম, ‘এই তো, চলছে।’
তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন আমার বেতন বাড়ছে না শুনে দেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়ে গেছেন।
বললেন, ‘তোমাদের বয়সে আমরা কত কিছু করেছি! সংসার করেছি, জমি কিনেছি, ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছি।’
আমি মাথা নাড়লাম। আত্মীয়স্বজনের সামনে মাথা নাড়ানো খুব জরুরি। এতে তারা বুঝতে পারেন, আপনি তাদের কথা মন দিয়ে শুনছেন।
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘তা তোমার সঞ্চয় কেমন?’
এবার আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। বেতনের খবর নেওয়া পর্যন্ত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু সঞ্চয়ের হিসাব জানতে চাওয়া মানে আমার পকেটের ওপর সরাসরি তদন্ত শুরু করা।
বললাম, ‘বিশেষ কিছু নেই।’
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘এই বয়সে সঞ্চয় না করলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়বে।’
আমি বললাম, ‘জি।’
‘বাড়ি করার চিন্তা করেছ?’
‘করছি।’
‘কোথায় করবে?’
‘এখনো ঠিক করিনি।’
তিনি মাথা নাড়লেন। তার মাথা নাড়ানোর মধ্যে এমন একটা হতাশা ছিল, যেন আমি বাড়ি না করে তার সম্পত্তি বৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করেছি।
এরপর শুরু হলো সন্তান প্রসঙ্গ। তিনি জানতে চাইলেন, ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিকল্পনা।
আমি ভাবলাম, মানুষকে জেরা করার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ লাগে কি না। লাগলে এই ভদ্রলোক নিশ্চয়ই প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষক।
হঠাৎ সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ছেলের চাকরির কী খবর?’
তিনি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। সরু চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘ওসব কথা থাক। তোমার কথা বলো।’
আমি বুঝলাম, আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। পাল্টা প্রশ্ন করা যায় না। সুতরাং এটি পারিবারিক সংবিধানের অঘোষিত ধারা।
যাওয়ার আগে তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কোনো দরকার হলে আমাকে বলবে। আমি তোমাদের কাছের মানুষ। যখন বলবে চলে আসব। বিপদে আত্মীয়স্বজন এগিয়ে না এলে কে আসবে!’
আমি আবেগাপ্লুত হলাম। এতক্ষণ আমার বেতন, সঞ্চয়, বাড়ি, বাচ্চার ভবিষ্যৎ— সবকিছুর হিসাব নিয়েছেন। এবার নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন। আর্থিক বা অন্য কোনো উন্নতির পথ বাতলে দেবেন।
তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, তোমার কাছে হাজার দশেক টাকা হবে? মাসের শেষে দিয়ে দেব।’
আমি টাকা দিলাম। তিনি চলে যাওয়ার পর স্ত্রী বলল, ‘তোমার আত্মীয় তো বেশ ভালো। সব খবর রাখেন।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। শুধু একটা খবর নিতে ভুলে গেছেন।’
স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘কী খবর?’
‘তাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে টাকা আছে কি না, সেটি আগে জানলে এত জেরার দরকার হতো না।’



