যদি

রফিক সাহেব মানুষটা খারাপ না। কিন্তু সমস্যা একটাই। তিনি কারও বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেন না। সব বিষয়েই ভিন্নমত পোষণ করেন। আপনি বলবেন, ‘আকাশ নীল।’
তিনি বলবেন, ‘সবসময় নীল থাকে না।’
আপনি তার কথা মেনে নিয়ে বলবেন, ‘ঠিক বলেছেন। আকাশ সন্ধ্যায় কিছুটা লালও হয়।’
তখন তিনি বলবেন, ‘আপনি আমার কথা বোঝেননি। আকাশের কোনো রঙ নেই।’
এভাবে খোঁচাখুঁচি চলতেই থাকে। তাই তার সামনে চুপ থাকার চেষ্টা করি। তবে একদিন মুখ ফসকে বলে ফেললাম, ‘এবার শীতটা বেশ আগে পড়েছে মনে হয়।’
রফিক সাহেব কথা মাটিতে পড়তে দিলেন না। আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই খোঁচাতে লাগলেন, ‘কই? শীত কোথায় পেলেন?’
‘সকালে বেশ ঠান্ডা ছিল।’
‘সকালের ঠান্ডা আর শীত এক জিনিস?’
পরদিন আমিই একটু মজা করলাম। বললাম, ‘আজ বেশ গরম পড়েছে।’
স্বাভাবিকভাবেই তার ভিন্নমত, ‘গরম কোথায়? ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে তো।’
আমি বললাম, ‘ঘাম হচ্ছে।’
তিনি বললেন, ‘ঘাম হলেই তাকে গরম বলা যাবে না।’
আমি থামলাম। রফিক সাহেবের সঙ্গে কথা বললে এই একটা সুবিধা। কোনো বিষয়ে শেষ পর্যন্ত যেতে হয় না। মাঝপথেই আলোচনার ইতি টানা যায়।
কিছুদিন পর একটা মজার ঘটনা ঘটল। চায়ের দোকানে নতুন একজন ভদ্রলোক এসেছেন। নাম কামাল সাহেব। তিনি রফিক সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হলেন। কিছুক্ষণ পর কথাবার্তা শুরু হলো।
রফিক সাহেব বললেন, ‘এই এলাকার মানুষ এখন আগের মতো নেই।’
কামাল সাহেব বললেন, ‘একদম ঠিক বলেছেন।’
রফিক সাহেব একটু থামলেন। তারপর বললেন, ‘আগের মানুষও খুব একটা ভালো ছিল না।’
কামাল সাহেব বললেন, ‘সেটাও ঠিক।’
রফিক সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, ‘আপনি কি আমার সব কথায় একমত?’
কামাল সাহেব হাসলেন, ‘না। তবে আপনার সঙ্গে তর্ক করার ইচ্ছা নেই।’
রফিক সাহেব সেদিন আর কোনো কথা বলেননি। আমি মনে মনে খুশি হলাম। অবশেষে এমন একজনের দেখা পাওয়া গেল, যিনি রফিক সাহেবকে থামাতে পেরেছেন।
পরদিন চায়ের দোকানে গিয়ে দেখি, দুজন পাশাপাশি বসে আছেন। বেশ গল্প জমেছে। আমি কাছে যেতেই রফিক সাহেব বললেন, ‘কামাল সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগছে। ভদ্রলোকের চিন্তাভাবনা আমার সঙ্গে মেলে।’
কামাল সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ‘আসলে আমি কথা কম বলি।’
আমি চা শেষ করে মুখ বন্ধ করে বসে থাকলাম। পৃথিবীতে সব সমস্যার সমাধান তর্ক করে হয় না। কিছু সমাধান আসে তর্ক বন্ধ করার পর।



