শূন্যতা থেকে নেতৃত্ব : তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—ফাইল ছবি
২০০৬ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তাপ ও ঝাঁকুনি সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসনব্যবস্থা দেশের প্রচলিত দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারাকে ভেঙে দিয়ে তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার মাধ্যমে এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার তৎপরতা চালায়।
এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামো, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা এবং সার্বিক গণতান্ত্রিক চর্চার ধারার ওপর অত্যন্ত গভীরভাবে পড়েছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে উদীয়মান তারেক রহমান রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গ্রেপ্তার ও নানা ধরনের অমানবিক চাপের মুখে পড়েন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তিনি একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তারেক রহমানের উপস্থিতির অভাব বিএনপির জন্য দীর্ঘ সময়জুড়ে এক কঠিন ও ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।
অন্যদিকে, পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দেড় দশক টানা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান করে দেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একক প্রভাব বিস্তার করে। বারবার সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক কাঠামোর রূপান্তরের ফলে বিএনপিসহ দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ক্রমাগত দমন-পীড়ন, হাজার হাজার মামলা ও চরম আইনি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। একই সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্ররা মাঠের রাজনীতিতে প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য জোটভুক্ত দলগুলো বিভিন্ন আইনি ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখে তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে ইতিহাস প্রমাণ করে, রাজনীতিতে শারীরিক দূরত্ব বা সাময়িক অনুপস্থিতি সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি করলেও তা ক্ষেত্রবিশেষে একজন নেতার চিন্তার পরিপক্বতা অর্জন ও রাষ্ট্রীয় দর্শনে নতুনভাবে প্রস্তুত হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে দেয়। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তারেক রহমান দেশটির সুসংহত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, আধুনিক সংসদীয় ঐতিহ্য, স্বচ্ছ পররাষ্ট্রনীতি, নাগরিক অধিকারের মানদণ্ড এবং প্রবৃদ্ধিভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন। প্রবাসের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুণগত চর্চা তার ব্যক্তিসত্তা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কতটা ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে, তা পরবর্তীতে তার উপস্থাপিত ৩১ দফার মতো জাতীয় রূপরেখা ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের বিভিন্ন বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সৌন্দর্য ও মূল শক্তি কেবল সরকার পরিচালনার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত থাকে না; বরং শক্তিশালী ও গতিশীল বিরোধী দল, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতার ওপর ভিত্তি করেই দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক প্রায় সময়ই সদ্বাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে সংঘাতের রূপ নিয়েছে, যেখানে ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ না ভেবে শত্রু বিবেচনা করার রাজনৈতিক ধারা প্রাধান্য পেয়েছিল।
এই বিভাজনমূলক, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ক্ষতিকর চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন, আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এখন পুরো জাতির জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তারেক রহমানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায়িত্ব কেবল স্বীয় দলকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা নয়; বরং চিরাচরিত ক্ষমতার রাজনীতিকে একটি দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তায় রূপান্তর করা। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এই বার্তা গভীরভাবে পৌঁছে দেওয়া জরুরি যে, রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা ভোগের হাতিয়ার হতে পারে না। ক্ষমতা হলো জনগণের কাছে শতভাগ জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ করার এক পরম সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। নেতৃত্বের দর্শনে এই মৌলিক পরিবর্তন আনা গেলে জনগণের রাজনৈতিক অনাস্থা দূর হয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
এই প্রত্যাশিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান স্তম্ভ হওয়া উচিত সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক সুস্থ, সম্মানজনক ও গঠনমূলক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলা। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আদর্শগত মতের ভিন্নতা থাকবে, সংসদের ভেতর ও বাইরে তীব্র তর্ক-বিতর্ক ও কঠোর সমালোচনা থাকবে; কিন্তু জাতীয় অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় মৌলিক প্রশ্নে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। শিক্ষার আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসেবা সুসংহত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্নীতি দমন এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি নেতৃত্বের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নেতার নিজস্ব জীবনাচরণ ও মানসিকতা, যা সার্বিক দলীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সরলতা, সংযম, সততা এবং সাধারণ মানুষের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারে, তবে তার অনুকরণ ঘটে দলীয় প্রতিনিধি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আচরণেও। দেশের মানুষ আজ এমন নেতৃত্ব চায়, যারা ক্ষমতার প্রভাবে জনগণের দৈনন্দিন সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না; বরং বিনয় ও সংবেদনশীলতা বজায় রেখে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।
নতুন ও ভারসাম্যপূর্ণ এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি বিষয়কে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে, যেখানে প্রথমত, দলীয় অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে মেধা, সততা ও যোগ্যতাকে পদায়ন ও মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করতে হবে; দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয়করণমুক্ত করে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে; তৃতীয়ত, ভিন্নমতকে দমনের চেষ্টা না করে তা গণতান্ত্রিক উপায়ে মোকাবিলা করার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে; চতুর্থত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সর্বোপরি, রাজনৈতিক দলকে ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক কাঠামোর ঊর্ধ্বে তুলে একটি আধুনিক, নীতিনির্ভর ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠনে রূপান্তর করতে হবে।
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মানুষ কেবল ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে, কিন্তু রাজনৈতিক আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও স্থায়ী স্বস্তি পায়নি। তাই বর্তমান বাস্তবতায় প্রধান প্রশ্নটি কেবল কারা ক্ষমতায় থাকবে তা নয়; মূল প্রশ্ন হলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে, বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার কতটা নিরাপদ থাকবে এবং সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগ্রহণে কতটা গুরুত্ব পাবে।
তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার আলো যদি তাকে একটি সহনশীল, আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শন নির্মাণে সহায়তা করে থাকে, তবে দেশের রাজনীতির জন্য তা শুভসূচনা বয়ে আনতে পারে। তবে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাফল্য কেবল একা শীর্ষ নেতার ওপর নির্ভর করবে না; দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদেরও সেই নতুন রাজনীতিকে হৃদয়ে ধারণ করে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক আচরণের অর্থবহ গুণগত রদবদল। প্রতিহিংসার জায়গায় সহনশীলতা, দখলের জায়গায় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়াই হোক আগামীর রাজনীতি। তারেক রহমানের নেতৃত্ব যদি এই পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তবে তা একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



